আলোকপাত

হারিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:৫৮

আবুল কাসেম ভুঁইয়া

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি। আমাদের দেশের মানুষ কৃষিজাত পণ্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এদেশে উত্পাদিত ধান, পাট, শাকসবজি দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। একসময় আমাদের দেশে উত্পাদিত পাট সারা বিশ্বে সমাদৃত ছিল। উত্পাদিত ধান দিয়ে দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা মিটছে। বর্তমানে আমাদের দেশের কৃষিজমিগুলো ক্রমেই কমে যাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়—ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগর সম্প্রসারণ এবং শিল্প উন্নয়নের কারণে সারাদেশের ফসলি জমিগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে ফসলি জমিতে দুই থেকে তিনবার ধান অথবা অন্যান্য ফসল উত্পন্ন হতো। বর্তমানে ফসলি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ফসলি জমিগুলো হারিয়ে যাওয়ায় ধান অথবা অন্যান্য ফসল আগের মতো উত্পন্ন হচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, গত কয়েক বছরে দেশের ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি অকৃষিখাতে চলে গেছে। শুধু চট্টগ্রামেই প্রতিবছর অকৃষিখাতে চলে যাওয়া জমির পরিমাণ ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা শীর্ষক সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। আরো জানা যায়, ১৯৭৬ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত ৪০ বছরে এজমির পরিমাণ গড়ে কমেছে ১ দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নগরায়ণের জন্য কৃষিজমি অকৃষি জমিতে পরিণত হয়েছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে দেশে খাদ্য উত্পাদন অনেক কমে যাবে। যেখানে দেশের অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা হচ্ছে কৃষি, সেখানে কৃষিজমি হারিয়ে গেলে কৃষকরা বেকার হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর এক-চতুর্থাংশই এখন হুমকির সম্মুখীন। কৃষিজমি অকৃষিতে চলে যাওয়ার জন্য ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাই অন্যতম কারণ। শহরে জনসংখ্যার চাপবৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ ক্রমেই শহরতলী এলাকায় চলে যাচ্ছেন। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে সারাদেশে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল ২ কোটি সাড়ে ৪৮ লাখ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬০০টি। ১৯৯৬-২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে বসতবাড়ির এলাকার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার একর। তা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ৭৭ হাজার একর। তাছাড়া শহরের বাইরে এখন অসংখ্য আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে। বড়ো বড়ো রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা স্বল্পদামে ফসলি জমি ক্রয় করে মাটি ভরাট করে আবাসিক এলাকার জন্য প্লট তৈরি করে বিক্রি করছে। এখানেও ফসলি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। বড়ো বড়ো শিল্পপতিরা গ্রামেগঞ্জে গিয়ে অল্পদামে ফসলি জমি ক্রয় করে বড়ো বড়ো শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করছেন। ফসলি জমি হারিয়ে গেলেও নতুনভাবে আর কোনো ফসলি জমি সৃষ্টি হচ্ছে না। ফসলি জমিগুলো হারিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের পরিকল্পনার অভাবই মূল কারণ। দেশে বিস্তীর্ণ অনাবাদি জায়গা পড়ে আছে। এসব জায়গাগুলো আবাদ করে শিল্পাঞ্চল অথবা আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা যায়। দেশের ফসলি জমি রক্ষা করার এখনই সময়। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের কৃষিজমিগুলো রক্ষা করে নতুন নতুন অনাবাদি জায়গায় আবাসিক এলাকা অথবা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশের কৃষি এবং ফসলি জমি রক্ষা করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

n লেখক: বীমা কর্মকর্তা