রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভারের উপর দিয়া যাইতেছে সারি সারি ভ্যান-রিকশা। খিলক্ষেত হইতে কাঁচা সবজি ভর্তি করিয়া খুচরা বিক্রির জন্য কুড়িল প্রান্তে নামিতেছে তাহারা। পাশ দিয়া যাইতেছে বাস, পিকআপ এবং মোটরসাইকেল। ধীরগতির এইসকল যানবাহনের কারণে ফ্লাইওভারের উপরে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িতেছে, সঙ্গে যানজট। আর ফ্লাইওভারগুলির মুখেই বাস থামাইয়া চলে যাত্রী ওঠা-নামা। ইহাতে দ্রুতগতির গাড়িগুলি প্রায়শই দুর্ঘটনার মুখে পড়িতেছে। কোথাও কোথাও বসিয়াছে চায়ের দোকান। এই চিত্র প্রায় সকল ফ্লাইওভারের বেলায়ই দৃশ্যমান। মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দখল করিয়া দোকান, অবৈধ পার্কিং, ফলের দোকান, মাছের হাট বসাইয়া চলিতেছে সিন্ডিকেট বাণিজ্য। রাজারবাগ স্কুলের সামনে আছে লেগুনা স্ট্যান্ড ও মোটরসাইকেল পার্কিং। সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যালের সামনে হইতে মৌচাক মার্কেট পর্যন্ত গাড়ির পার্কিং। শান্তিনগরের কর্ণফুলী মার্কেটের সামনে, কাওরান বাজার এবং ইস্কাটন ইউটার্ন ও চৌধুরী পাড়ায় ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে এই তিন অংশে প্রায়শই যানজট লাগিয়া থাকে। নিউ ইস্কাটনের সড়ক ও ফুটপাথ অনেকটাই গাড়িব্যবসায়ীদের দখলে। মালিবাগ ফ্লাইওভারের কিছু অংশ উত্তর সিটি করপোরেশনে বাকি অংশ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায়। ফলে কোনো সংস্থা এই ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণে নজর দেয় না। এই সমন্বয়হীনতায় ফ্লাইওভার ঘিরিয়া অপরাধীদের তত্পরতা বাড়িয়াছে। উল্লেখ্য, রাজধানীতে যানজট নিরসনসহ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের জন্য পাঁচটি ফ্লাইওভার এবং দুইটি ওভারপাস নির্মাণ করা হইয়াছে। পরিবহনসেবায় স্বস্তি আনিতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হইলেও পুরাপুরি স্বস্তি মিলে নাই।
ফ্লাইওভারগুলি বর্তমানে এক আজানা আতঙ্কে পরিণত হইয়াছে। ঘটিতেছে ছিনতাই, হত্যার মতো ঘটনা। কোনো কোনো ফ্লাইওভারের উপরের অংশ ভাঙিয়া একাকার হইয়া আছে। রাতে ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল আরোহীরা যখন-তখন বিপদে পড়িতেছেন। বেপরোয়া গতির কারণে প্রায়শ দুর্ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটিতেছে। কোনো কোনো ফ্লাইওভারের উপর দিয়া ভারী মালামাল বহনকারী লরি, পাথরবোঝাই ট্রাক ও ট্রেইলার চলাচলের কারণে এগুলির স্থায়িত্বও হুমকির মুখে। গুরুত্বপূর্ণ এইসকল স্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা খুব একটা নাই বলিলেই চলে। ফলে ছিনতাই বা যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাইতে উড়ালসড়ককে নিরাপদ মনে করিতছে অপরাধীরা। রাত্রে বাতি না জ্বলায় অন্ধকারে ভূতুড়ে পরিবেশে প্রায়ই ঘটিতেছে ছিনতাই, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা। সর্বশেষ গত ২৬ আগস্ট রবিবার রাত্রে রাজধানীর মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারে পাঠাও চালককে আঘাত করিয়া তাহার মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন ছিনাইয়া নেয় দুর্বৃত্তরা। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় পাঠাও চালকের মৃত্যু হয়। দিনের বেলা, বিশেষত সকাল ও সন্ধ্যায় ফ্লাইওভারের নিচে চলে মাদক সেবন ও কেনাবেচা। মহাখালী, মৌচাক ও যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে মাসে গড়ে ১৫-২০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিতেছে।
পৃথিবীর অন্য দেশগুলি ফ্লাইওভার ভাঙিতেছে, আর আমরা তৈরি করিতেছি। যানজট যন্ত্রণা হইতে মুক্তি দিতে ফ্লাইওভার ক্রমেই জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। নগরের এক স্থান হইতে অন্যত্র সহজেই যাওয়া যাইতেছে ফ্লাইওভারের কল্যাণে। প্রচুর অর্থে ফ্লাইওভারগুলি নির্মিত হইলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। রাজধানীর ৫৪টি সেবা সংস্থার সমন্বয়হীনতায় এই পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে। নগর সরকার গঠন করিয়া মেয়রকে এই বিষয় দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া যাইতে পারে। নগরজীবনে এমনিতেই সমস্যা ও ভোগান্তির কোনো অন্ত নাই। তাহার ওপর নিরাপত্তার দুর্ভাবনা এইভাবে বাড়িতে থাকিলে মানুষ যাইবে কোথায়! অপরাধী দমনে বাহিনীগুলিকে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়া অভিযান পরিচালনা করিতে হইবে।
