আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্যচর্চা প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:২৮

আবুল মনসুর আহমদের তিনটি পরিচয় : সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সাহিত্যিক। তার সাহিত্যকর্মে এই সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সুস্পষ্ট স্বাক্ষর বর্তমান। ‘আয়না’ ও ‘ফুড কনফারেন্স’ আবুল মনসুর আহমদের বৈশিষ্ট্যব্যঞ্জক সাহিত্য সৃষ্টি হিসেবে সুপরিচিত। একই ধারায় গ্রন্থ হিসেবে ‘গালিভারের সফরনামা’ও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বর্তমান আলোচনায় আমি সংক্ষেপে এই গ্রন্থ সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করব।

‘গালিভারের সফরনামা’ গ্রন্থে সংকলিত এগারোটি নকশার মধ্যে ছয়টি ১৩৪৪ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অর্থাত্ ১৯৪৭ পূর্ববর্তীকালে লেখা এবং বাকি পাঁচটি ১৯৪৭ পরবর্তী। সবগুলো লেখার বিষয় রাজনীতি।

সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী লেখাগুলো প্রকাশ তারিখ অনুসারে সাজালে তালিকা হয় এরকম—ইলেকশন (১৩৪৪), অথ কুত্তাশিয়াল চরিতামৃত (কার্তিক ১৩৫১), চেঞ্জ অব হার্ট (১৩৫২) ও মডার্ণ ইব্রাহিম (১৩৫৩)।

ইংরেজ আমলে যখন দেশীয় মন্ত্রী নিয়োগ ও আইনসভার নির্বাচন প্রবর্তন হয় তখন জনৈক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলার নির্বাচনে অংশগ্রহণ, পরাজয় ও পুনরায় সরকারি চাকরির তদবির ‘ইলেকশনের’ বিষয়। আমলারা যে মূলত জনসংযোগহীন, তার ক্ষমতা-জ্যোতি কেবল চেয়ার বিচ্ছুরিত এবং অবসরপ্রাপ্তির পরই সমাজে ও দেশে তার যথার্থ স্থান নির্ধারিত হয়—ইলেকশন গল্পে এ বক্তব্য লেখক চমত্কারভাবে উপস্থাপন করেছেন।

‘অথ কুত্তা-শিয়াল চরিতামৃত’ ইংরেজের ভেদনীতি ও হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব প্রাসঙ্গিক। পাঁচটি দৃশ্যে বিভক্ত এই নাট্যচিত্রে তিনটি প্রধান চরিত্র বাঘরাজা, কুত্তা ও শিয়াল। রাজা কুত্তাকে পরামর্শ দিতেছে ‘গাভিন শিয়ালনী ও সদ্য-বিয়ান বাচ্চা শিয়ালের চর্বি ব্যবহার’ করে বাঁকা লেজ সোজা করতে কেননা ঐ সোজা লেজেই শিয়ালের শক্তি। অন্যদিকে রাজা শিয়ালকে পরামর্শ দিয়েছে লেজ কুণ্ডলীকৃত করবার, কেননা তাতেই কুত্তার শক্তি :

‘রাজা : তোমাদের ঝাড়ু মার্কা সোজা সরল লেজকে জিলিপির মত সুশ্রী সুন্দর কুণ্ডলীকৃত করিবার সাধনায় আজ হইতেই লাগিয়া যাও আর যতদিন তা না হয় ততদিন স্বরাজ-স্বাধীনতা আন্দোলন ঠেকাইয়া রাখ।

শিয়াল : তা ঠেকাইব নিশ্চয়ই। কিন্তু এই সোজা লেজকে অমন সুন্দররূপে বাঁকা করিব কিভাবে?

রাজা : কুত্তার সদ্যোজাত শাবকের চর্বি নিজ নিজ লেজে মাখিবে এবং সূর্যোদয়ের প্রথম কিরণে চন্দন কাঠের ধূঁয়ায় শেক দিবে।’

অপরদিকে কুত্তাকে বলিলেন, ‘সাহসে, বীরত্বে, কণ্ঠস্বরে, ঐক্যে ও সংহতিতে শ্রেষ্ঠ জাতি হইয়াও একটি ব্যাপারে তোমাদের দেহ ত্রুটিপূর্ণ সেটা তোমাদের লেজের ত্রুটি। ঐটি বাঁকা। অথচ শেয়ালেরটি সোজা। সেজন্য ওরা তোমাদের টেক্কা দিতেছে।’

সেই হইতে কুত্তারা লেজ সোজা করিবার এবং শিয়ালেরা লেজ কুণ্ডলী করিবার গোপন সাধনা করিতেছে। আন্দোলন বন্ধ আছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনে নির্বিবাদে রাজত্ব করিতেছে।

ইংরেজ সরকারের প্রাদেশিক মন্ত্রীর পদ যে চাকরি মাত্র এবং মন্ত্রীমহোদয় যে আমলাদের হেলার বস্তু—একথা ‘অনারেবল মিনিস্টার’ গল্পে চিত্রিত হয়েছে।

সাতচল্লিশপরবর্তী লেখাগুলোর কালানুক্রমিক তালিকা—শিক্ষা সংস্কার (মে ১৯৫২), রাজনৈতিক বাল্যশিক্ষা (আগস্ট ১৯৫২), আহা যদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতাম (১৩৬০), গালিভারের সফরনামা (১৯৫৪) ও রাজনৈতিক ব্যাকরণ (১৯৫৮)।

নাট্যচিত্র ‘শিক্ষাসংস্কার’ পাকিস্তান আমলের প্রথম পর্যায়ে মন্ত্রী-নেতা-আমলার শিক্ষা বিষয়ক বিকৃত চিন্তার, শঠতার ও প্রবঞ্চনার দর্শন। এটি আবুল মনসুর আহমদের একটি মহত্ শক্তিশালী রচনা এবং এতে প্রচুর চিন্তার খোরাক আছে।

গালিভারের সফরনামা নকশায় ‘৯২ ক-ধারা’, ‘ক্যাবিনেট অব ট্যালেন্টস’ এবং শাসনতন্ত্রহীন শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ আছে। এই লেখাটি আবুল মনসুর আহমদের রচনা-উত্কর্ষের দ্যোতক এবং সামগ্রিকভাবে একটি উল্লেখযোগ্য রচনা।

‘আহা! যদি প্রধান মন্ত্রী হতে পারতাম’—এই কাহিনিতে প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক ওয়াহেদ মাস্টারকে সামনে রেখে লেখক পাকিস্তানি রাজধানীর উপরতলার ভন্ডামিকে তুলে ধরেছেন। নির্বাচন, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রসঙ্গে এখানে মন্তব্য তীব্র ব্যঙ্গমিশ্রিত। ওয়াহেদ মাস্টারের ভাষায় :

‘অন্যান্য দেশে খরিদ্দার বাড়াবার লাগি মুদ্রামূল্য কমায় আমরা ইউনিক জাতি। আমরা তো আর অমুসলমানদের অনুকরণ করতে পারি না। তাই আমরা খরিদ্দার বাড়াবার জন্য মুদ্রা কমাই। মূল্য অর্থাত্ ইয্যত কমাই না। ইয্যতটাই আমরার বড় কথা। মুদ্রা অর্থাত্ টাকা আমরার বড় কথা নয়, ওটাতো হাতের ময়লা। — ব্যাপার হচ্ছে এই : হিন্দুস্থানীদের আমরা বললামঃ আমরা টাকা তোমরার টাকার দেড়া, মানবে কি না বল। না মানলে তোমরার সাথে আমরার কোন কাজ কারবার নাই। হিন্দুস্থানীরা কইল : ‘আপনেরা যখন বললেন দেড়া আমরা কি না মেনে পারি? নিশ্চয়ই মানলাম।’ তবে আপনারা মুসলমান বাদশার জাত, আর আমরা হলাম গরীব মানুষ বামুন-কায়েতের জাত। দেড় টাকা দিতে পারব না, বার আনা দিবেঃ বাকী বার আনা আমরা মাফ চাই। হিন্দুরা আমরারে বাদশার জাত কইছে, আর চাই কি? দিয়া দাও মাফ বার আনা।

বার আনা দিলেই পাকিস্তানী এক টাকা পাওয়া যায়। এখন বুঝলেন? আমরার টাকার দাম ঠিকই থাকল, ওরা বার আনা চেয়ে নিল মাত্র।’

‘ইউনিক সমাজতন্ত্র আমরার ইউনিক সোশালিজমে খাদ্য বা খানেওয়ালা কাকেও ডিসটার্ব করা হবে না। আমরা শুধু খাদ্যাভাবের ইকুয়াল ডিস্ট্রিবিউশন নিয়াই সন্তুষ্ট থাকব।

খাদ্যাভাব অর্থাত্ দুর্ভিক্ষও আমাদের দেশের একটা সম্পদ— পাটের মতই বড় সম্পদ। উভয় সম্পদের দ্বারাই কারো সর্বনাশ আর কারো ভাদ্রমাস হতেছে। — দুর্ভিক্ষের ব্যবসাতে অনেক রিলিফ কর্মী, জনসেবক ও খাদিমুল ইনসানের ভাদ্রমাস হওয়ার ব্যাপারে আপনে দেখেন নাই বুঝি? যা হোক আমরার ইউনিক সোশালিজমের নীতি হবে দুর্ভিক্ষ-সম্পদকে দেশের সর্বত্র ইকুয়ালী ডিস্ট্রিবিউট করা। ইংরাজ আমলে দেশের এক জায়গায় দুর্ভিক্ষ হত, দশ জায়গায় হত না। এটা ছিল অন্যায় ও পক্ষপাতমূলক। তাই আমরার কাজ হবে সর্বাগ্রে এই পক্ষপাতমূলক সাম্রাজ্যবাদী ডিভাইড এ্যান্ড রুল নীতির অবসান। আমরার নীতি হবে সমস্ত বৈষম্য দূর করা। এক জায়গায় দুর্ভিক্ষ হবে, আরেক জায়গায় হবে না, মুসলমান হয়ে এমন বৈষম্য ও অন্যায় আমরা কিছুতেই বরদাশত করতে পারি না।’

দেশে নির্বাচনের কোন প্রয়োজন নেই কেননা ‘ইলেকশন হলে জাতীয় প্রতিষ্ঠান শতকরা একশটা সিটই দখল করবে, কারণ দেশবাসী অন্তরে অন্তরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পিছনেই আছে।’ তবু গণতন্ত্রের খাতিরে নির্বাচন প্রয়োজন— এই কথার উত্তরে— ‘কেন দেওয়া উচিত? সুস্পষ্ট সত্যকে পয়সা খরচ করে পরখ করতে হবে? সুরুজ উঠছে কি না, হারিকেন জ্বালায়ে তা দেখতে হবে? আমার প্রতি আমার স্ত্রীর আনুগত্য আছে কিনা সেটা কি তার ভোট নিয়া জানতে হবে? তার ব্যবহারই কি যথেষ্ট নয়? অতএব আমার মতে যতদিন মন্ত্রীরা না বুঝবেন যে ইলেকশন হলে তার ফলে একটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে, ততদিন ইলেকশন দিয়া পয়সা খরচ করা উচিত না।’

‘রাজনৈতিক বাল্যশিক্ষা’ ও ‘রাজনৈতিক ব্যাকরণ’ ভিন্ন আঙ্গিকের দুটি লেখা। প্রথমটি ১৯৫২ সালের রচনা—এতে হুল আছে। দ্বিতীয়টি ১৯৬৮ সালে লেখা এবং উত্কৃষ্টতর। শিরোনাম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি অসামান্য ব্যঙ্গ রচনা। সুবিস্তৃত শিরোনামটি নিম্নরূপ :

‘রাজনৈতিক ব্যাকরণ/হ্যারল্ড্ ল্যাস্কিও গ্রামার অব পলিটিক্স ও ডঃ মোঃ শহিদুল্লার প্রথম বাংলা ব্যাকরণের খামিরা মিশাল ‘বিয়া’ করণ। এরই প্রথমেই রাজনীতির যে সংজ্ঞা লেখক দিয়েছেন তা এ দেশী রাজনীতির দর্শন বিশেষ :

তাই হিন্দুস্থানী মনুষ জাতি যে আচরণের দ্বারা রাজদরবারে নীত হয়, এবং তথায় গোপাল ভাঁড়ের মত সাফল্যের সাথে মনের ভাব গোপন রাখিয়া রাজা প্রজা উভয় পক্ষকে ফাঁকি দিতে পারে তাকে রাজনীতি বলা হয়। রাজনীতি মোটামুটি তিন প্রকার ঃ (ক) রাজা (বাদশা) নীতি, (খ) রাজ (সরকার)-নীতি, (গ) রাজ (মিস্ত্রী)-নীতি। ‘ক’-এ সৈন্যবাহিনী, ‘খ’-এ কর্মী বাহিনী ও ‘গ’-এ যোগালিয়া বাহিনী দরকার। ...’

এই লেখাটি আবুল মনসুর আহমদের রাজনীতি-সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ ফসল এবং অবশ্য-পাঠযোগ্য।

আমি প্রথমেই উল্লেখ করেছি যে, আবুল মনসুর আহমদের লেখায় রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—এই ত্রিধারার সম্মিলন ঘটেছে। আবুল মনসুর আহমদের লেখায় দেশ ও দেশের মানুষের সমস্যার প্রত্যক্ষ পর্যালোচনা আছে। ব্যঙ্গবিদ্রূপের আঘাতে সমাজ ও দেশের চৈতন্য জাগরণ তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তাই তার সাহিত্য আমাদের দেশ ও দেশের মানুষের কাছে তাত্পর্যবহ। জীবদ্দশায় রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ, সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদকে আড়াল করে দিলেন। আজ মৃত্যুর পর রাজনীতিক ও সাহিত্যিক সমাজ পাল্লায় দাঁড়িয়েছেন। ভবিষ্যতে তার সাহিত্যিক পরিচয়ই মুখ্য হবে—এই আমার বিশ্বাস।

আবুল মনসুর আহমদ (৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮—১৮ মার্চ ১৯৭৯)