‘মিস আর্থ কুইন অ্যাওয়ার্ড’ সোহাগীর মুকুটে নতুন পালক

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৪০

যারা কখনো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারেন না, তাদের পায়ের তলায় নাকি সরষেদানা থাকে। লক্ষ্মীপুরের মেয়ে সোহাগীর পায়ের তলায় যেন লক্ষ কোটি সরষেদানা ছাড়ানো। প্রায় দুই দশক আগেই মাতৃত্বের কোমল ক্রোড় থেকে নাজমুন নাহার সোহাগী কঠিন পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়েছেন অপার এক দুঃসাহসে। আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, একা একটি মেয়ে ঘুরে ফেলেছেন বিশ্বের ১৩০টি দেশ! তিনি একা একা কখনো সাহারার মরুভূমি, কখনো বিপত্সংকুল আফ্রিকান জঙ্গল আবার কখনো বা সমুদ্রের তলদেশে গিয়েছেন। তিনি সড়ক পথে সফর করেছেন ইউরোপ ও এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ! বাংলাদেশের এই নারী ২০১৬ ও ২০১৭ সালে টানা ঘুরেছেন ৩৫টি দেশ! ২০১৮ সালে তিনি পৃথিবীর মানচিত্রের ৩২টি দেশ সফর করেছেন! সম্প্রতি ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সড়ক পথে ঘুরেছেন পশ্চিম আফ্রিকার ১৫টি দেশ। এর মাধ্যমে তার শেষ হয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি ও গোল্ড কোস্ট লাইনের প্রতিটি দেশ ভ্রমণ! সম্প্রতি আমেরিকা ও কানাডার সীমান্তবর্তী নায়াগ্রা জলপ্রপাতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে তিনি সম্পন্ন করেন তার বিশ্বভ্রমণের ১৩০তম দেশ।

এসব দুঃসাহসী ভ্রমণের জন্য তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। অর্জন করেছেন বাংলাদেশের নারীদের সম্মাননার ‘অনন্যা শীর্ষদশ’ পুরস্কার। তার বিশ্ব অভিযাত্রার মাইলফলকের সম্মাননা স্বরূপ জাম্বিয়া সরকারের গভর্নর হ্যারিয়েট কায়োনার কাছ থেকে পেয়েছেন ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি। এ ছাড়া এই বছর তিনি অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল সম্মাননা লাভ করেন। অর্জন করেন জনটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, তিন বাংলা সম্মাননা ও রেড ক্রিসেন্ট মোটিভেশনাল অ্যাওয়ার্ড।

সম্প্রতি তার পুরস্কারের গৌরবময় মুকুটে যুক্ত হয়েছে ‘মিস আর্থ কুইন অ্যাওয়ার্ড’। গত ১ সেপ্টেম্বর সারা পৃথিবী থেকে আগত কয়েক হাজার বাংলাদেশির মিলন মেলায় করতালিতে মুখরিত এক বিশেষ মুহূর্তে নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড শহরের নাসাউ কলসিয়ামে অনুষ্ঠিত ৩৩তম ফোবানা সম্মেলনে নাজমুন নাহারকে এই বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়াও ৩০, ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘নিউইয়র্ক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ আয়োজিত ইয়ুথ কনফারেন্সে তার বিশ্ব ভ্রমণের ওপর ‘উইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামক এজেন্ডায় নাজমুন নাহার অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য রাখেন এবং প্রেজেন্টেশন দেন। ইয়ুথ কনফারেন্স থেকেও নাজমুন নাহারকে সম্মানিত করা হয় ‘গ্লোব অ্যাওয়ার্ড’-এর মাধ্যমে।

ছোটোবেলায় স্বপ্ন দেখতেন পাখির মতো যে কোনো জায়গায় উড়ে চলে যেতে। পাখিদের স্বাধীন ওড়াওড়ি দেখে তিনিও মনের ভেতরে গেঁথে ফেলেন একটি অপূর্ব বিহঙ্গজীবন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বাংলাদেশ গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময়ে তিনি ভারতের ভূপালের পাঁচমারিতে যান। সেই যে তার পায়ের তলে সরষেদানা পড়ল, তিনি যেন এরপর থেকে আর স্থির থাকতে পারলেন না। নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণ তো কেবল বিমানপথে আরাম-আয়েসে কোনো দেশে পৌঁছে ভালো একটি হোটেলে রাত্রিযাপন করা নয়। তিনি একা একজন নারী হয়ে ১৩০টি দেশ ঘুরেছেন বললে কম বলা হয়। বলা যেতে পারে তিনি একা অ্যাডভেঞ্চারে নেমেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে নাজমুনের মতো এমন নারী বিরল যিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে হাজার হাজার মাইল সড়ক পথে একা একা ভ্রমণ করছেন নিজ দেশের পতাকা হাতে। দিনেরাতের অন্ধকারকে একাকার করে পর্বতে, সমুদ্রের তলদেশে, দুর্গম জঙ্গলে, বন্যপ্রাণীর পাহাড়ে, অজানা আদিবাসীদের এলাকায়—কোথাও যেতে ভয় পাননি এই নারী। বিপত্সংকুল জায়গায় তিনি সবখানেই কোনো না কোনো হূদয়বান ব্যক্তির সহযোগিতা পেয়েছেন।

দুঃসাহসী এই নারী পরিব্রাজকের জন্ম ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার হামছাদী ইউনিয়নের গঙ্গাপুর গ্রামে। তিনি বলেন— বাংলাদেশের লাল-সবুজের এই পতাকা আমার কাছে সবচেয়ে বড়ো শক্তি! এই পতাকা আমাকে ছায়া দিয়েছে অনেক! বাংলাদেশের এই লাল-সবুজের পতাকা বহন করার জন্য আমি সব কষ্টকে মাথা পেতে নিয়েছি! বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে ২০২১ সালের মধ্যে তিনি ভ্রমণ করতে চান বিশ্বের ২০০টি দেশ।

সারা পৃথিবী জুড়েই তিনি তরুণদের এভাবে উত্সাহিত করছেন নানাভাবে। বর্তমানে সুইডেন-প্রবাসী এই দুঃসাহসী অভিযাত্রী আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র লুব্ধকের মতো বিশ্ব শান্তির জন্য নিজের দ্যুতি ছড়াতে চান বিশ্বময়।

n লেখক :সাংবাদিক