গড় আয়ু বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যখাতের চমক

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৭

ষাটের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৬ বত্সর। আর ২০১৮ সালের শেষার্ধে আসিয়া সেই গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৮ বত্সরে উন্নীত হইয়াছে। মাত্র ৫৮ বত্সরের ব্যবধানে প্রায় ২৭ বত্সর গড় আয়ুবৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো ব্যাপক জনঘনত্বের দেশের জন্য বিস্ময়কর বলিলেও কম বলা হয়। এই সাফল্যের ব্যাপারে গত বুধবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলিয়াছেন যে, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধে গৃহীত কার্যকর পদক্ষেপের সুফল হিসাবেই দেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাইয়াছে।

বিশ্বে মানুষের গড় আয়ুর হিসাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নবম। আর সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে তৃতীয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু অনেক বেশি। ২০১২ সালে চিকিত্সা গবেষণা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ স্বাস্থ্যসেবার বিশ্ব জরিপে বাংলাদেশকে ৫২তম অবস্থানে রাখিয়াছে। তিনটি জাতিসংঘ পুরস্কারসহ মোট ১৬টি আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করিয়াছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত। গত ১০ বত্সরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি পাইয়াছে সাত গুণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়াছে যে, বাংলাদেশের গড় আয়ু বৃদ্ধির নেপথ্যে রহিয়াছে সরকারের বিভিন্ন সময়ের কার্যকর পদক্ষেপ। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানের সময় প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যু ছিল ৭৬৯ জন, ২০১৫ সালে তাহা কমিয়া দাঁড়াইয়াছে ১৩৮ জনে। শিশুমৃত্যুর হার বর্তমানে প্রতি হাজারে ৩৬ জন, অথচ ১৯৮০ সালে ছিল ১৪৯ জন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম প্রতি নারী গড়ে ৭টি সন্তান জন্মদান করিতেন; আর বর্তমানে সেই সংখ্যা কমিয়া দাঁড়াইয়াছে ২ জনে। বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করিয়াছে, যাহা পুরস্কৃতও হইয়াছে জাতিসংঘ কর্তৃক। বাংলাদেশ এখন পোলিওমুক্ত দেশ। বাংলাদেশের আইসিডিডিআর-বি কর্তৃক ডায়রিয়া এবং কলেরার প্রতিষেধক (খাবার স্যালাইন) আবিষ্কার; খাবার স্যালাইন বানানোর প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী জীবনরক্ষাকারী ঘটনা। বাংলাদেশের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য বিষয়ক সেবাদানকারী ‘কমিউনিটি ক্লিনিক মডেল/সবুজ ছাতা প্রকল্প’ এখন এশিয়া, আফ্রিকার অনেক দেশে অনুসরণ করা হইতেছে।

প্রকৃতপক্ষে, স্বাস্থ্যখাতে এমন ব্যাপক সাফল্য স্বল্পোন্নত ও সর্বাধিক জনঘনত্বের দেশ হইবার কারণে বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট কঠিন ছিল। সুতরাং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ তুলনামূলক সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সহায়ক হইয়াছে। তবে ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ গ্রামীণ জনপদে নূতন মাত্রায় ছড়াইয়া পড়িলেও গ্রামে চিকিত্সক না থাকিবার সমস্যা এখনও প্রকট। এই ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, এমনকী স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত উষ্মা প্রকাশ করিয়াছেন। অর্থাত্ সরকার যেই অবকাঠামো তৈরি করিয়াছে এবং করিতেছে, তাহাতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি চিকিত্সকশূন্য না থাকিলে গড় আয়ু আরো বৃদ্ধি পাইতে পারে। আমরা মনে করি, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্সক ধরিয়া রাখিবার ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সদর্থক ভূমিকা রাখিবার সুযোগ রহিয়াছে।