নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ১৯০৫ সালে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামক কল্পকাহিনিটি ইংরেজিতে Sultana's Dream নামে লিখেছিলেন। বেগম রোকেয়া তাঁর সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক দূরে দেখতে পেতেন। আর এজন্যই তিনি কল্পনার রথে চড়ে, এত সুন্দর করে অন্তঃপুরের নারীদের রাজ্যক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার স্বপ্ন বুনতে পেরেছিলেন।
বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানা’ এক অপরিচিত রমণীকে ভগিনী সারা মনে করে তাঁর আমন্ত্রণে তার সাথে বেড়াতে বের হয়ে নানান সৌন্দর্য উপভোগ করেন। তাঁর ইতস্ততা ও সংকোচ দেখে উক্ত রমণী তাঁকে জানালেন এটি নারীস্থান, এখানে কোনো পুরুষের সম্মুখে পড়তে হবে না। সুতরাং তাঁর ভয় নাই। সুলতানা তখন এই অপরিচিত মহিলাকে ভগিনী সারা মনে করেই কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর সঙ্গে শহর ঘুরে শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করে তাঁর মনে হলো ভারতবাসী ইচ্ছে করলে কলকাতাকে এর চেয়েও সুন্দর করে তুলতে পারে।
গল্পের এক অংশে ভগিনী সারা সুলতানাকে বলেন, কেবল শারীরিক বল বেশি হলে, কেউ প্রভুত্ব করবে এটা তারা স্বীকার করেন না। কারণ সিংহ বলে-বিক্রমে মানুষের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হলেও তারা মানবজাতির উপর প্রভুত্ব করে না। সুতরাং নারীরা সমাজের উপর কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়ে একাধারে নিজের প্রতি অত্যাচার এবং স্বদেশের অনিষ্ট দুই-ই করেছেন। ভগিনী সারা অফিসের কাজ-কর্মের পাশাপাশি নানা প্রকার সলমা-চুমকির কারুকার্যখচিত কাজও করেন। তিনি দুই ঘণ্টায় তাঁর অফিসের দৈনিক কাজ শেষ করতে পারেন বলে জানান। পুরুষেরা যে কাজ সাত-আট ঘণ্টায় করে, সে কাজ যে দুই ঘণ্টায় করা সম্ভব, তার ব্যাখ্যাও তিনি করেন।
নারীস্থানে কখনো কেউ মহামারী রোগে আক্রান্ত হয় না। এখানে মশার দংশনের অত্যাচার নেই। নারীস্থানে কারো অকালমৃত্যু হয় না। বিশেষ কোনো দুর্ঘটনা না হলে অপ্রাপ্ত বয়সে কেউ মারা যায় না। এসব কথা বলতে-বলতেই ভগ্নি সারা সুলতানাকে নিয়ে তাদের রন্ধনশালা দেখালেন। সুলতানা ভাবতে লাগলেন এটা কি রান্নাঘর, না কোনো ফুলের বাগান? চতুর্দিকে মনোরম সবজি বাগান এবং নানারকম তরি-তরকারির লতাগুল্মে পরিপূর্ণ। ঘরের ভেতর কোনো কালো ধোঁয়া নেই। রান্নাঘরের মেঝেও সাদা মর্মর পাথর দিয়ে নির্মিত। জানালাগুলো তাজা ফুলে সজ্জিত। সুলতানা জানতে চাইলেন তারা কীভাবে রান্না করে? রান্নাঘরে অগ্নি জ্বালাবার কোনো স্থান দেখছেন না! ভগিনী সারা তাঁকে জানান, তারা সূর্যতাপে রান্না করেন। সূর্যের তাপ সংরক্ষণ করা হয়। যা একটা বিশেষ নলের ভেতর দিয়ে আসে। সে নলটাও তাঁকে দেখানো হলো। কেবল তাই নয়, তিনি তাত্ক্ষণিক রান্না করে তাঁকে সেই রান্না প্রণালিও দেখালেন। ভগিনী সারা উল্লেখ করেন, ত্রিশ বছর পূর্বে তাদের বর্তমান মহারানি সিংহাসন প্রাপ্ত হন, তখন তিনি তের বছরের বালিকা ছিলেন। তিনি নামে রানি ছিলেন কার্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজ্য শাসন করতেন। ভগিনী সারা আরো উল্লেখ করলেন, ‘মহারানি বাল্যকাল হইতেই বিজ্ঞান চর্চা করিতে ভালোবাসিতেন। সাধারণ রাজকন্যাদের ন্যায় তিনি বৃথা সময় যাপন করিতেন না। একদিন তাঁহার খেয়াল হইল যে, তাঁহার রাজ্যের সমুদয় স্ত্রীলোকই সুশিক্ষা প্রাপ্ত হউক। মহারানির খেয়াল— সে খেয়াল তত্ক্ষণাত্ কার্যে পরিণত হইল। অচিরে গভর্নমেন্টের পক্ষ হইতে অসংখ্য বালিকা স্কুল স্থাপিত হইল। এমনকি পল্লিগ্রামেও উচ্চশিক্ষার অমিয়-স্রোত প্রবাহিত হইল। শিক্ষার বিমল জ্যোতিতে কুসংস্কাররূপ অন্ধকার তিরোহিত হইতে লাগিল এবং বাল্যবিবাহ-প্রথাও রহিত হইল। ২১ বছরের পূর্বে কোনো কন্যার বিবাহ হইতে পারিবে না এই আইন হইল। আর এক কথা, এই পরিবর্তনের পূর্বে আমরাও আপনাদের মতো কঠোর অবরোধে বন্দিনী থাকিতাম’।
বেগম রোকেয়া আজ থেকে একশ’ দশ-পনের বছর পূর্বে নারীর শিক্ষার গুরুত্ব দিয়ে পল্লিগ্রামেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বুনে গিয়েছেন। বাল্যবিয়ে যে নারীশিক্ষার অন্তরায়, তা তিনি চিহ্নিত করেছেন। নারীস্থানে নারীদের শিক্ষার জন্য দুটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং সেখানে ছেলেদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। এভাবে বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত আধুনিক এবং বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। তিনি অনেক সুন্দর একটি দেশের কল্পনা করে গেছেন। যেখানে মানুষ, ‘নারী-পুরুষ’ হিসেবে নয়, দু’জনেই মানুষ হিসেবে কাজ করবে। কেউ কাউকে অবমূল্যায়ন করবে না। যার-যার জায়গা থেকে কাজ করবে। শারীরিকশক্তি এবং বুদ্ধিমত্তা দু’টিকেই কাজে লাগিয়ে একটি দেশকে কীভাবে সুখের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা যায়, সেই স্বপ্ন রচনা করে গেছেন। কার্যত এই ‘সুলতানার স্বপ্ন’ কল্পকাহিনিটিকে আমরা আধুনিক ‘সাইন্স ফিকশনের’ সাথে তুলনা করতে পারি। তিনি সেই সময়েই বসে সৌররশ্মির ব্যবহার করে সংসারের দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করার কথা চিন্তা করতে পেরেছেন। সৌররশ্মিকে যুদ্ধে জেতার জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার পাশাপাশি মাঠের ফসল ফলানোর কাজে ব্যবহারের চিন্তা করেছেন। বৃষ্টির পানিকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রয়োজনমতো ব্যবহারের চিন্তা করেছেন। আজ বর্তমান বিশ্বে, ঠিকই সৌররশ্মির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বৃষ্টির পানিকে নিয়ন্ত্রণ করে আমরা আমাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিচ্ছি।
বেগম রোকেয়া তাঁর চিন্তাধারায় নিজেকে আধুনিক করতে পেরেছিলেন বলেই এ ধরনের স্বপ্ন বুনতে সমর্থ হয়েছিলেন। যা আজকে আমরা আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাঝে বিদ্যমান পাই। তাঁকে বেগম রোকেয়ার স্বপ্নদেখা রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখতে পাই। রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্নে’র রাজ্যের মহারানির স্বপ্ন, আর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্ম যেন এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। তিনি যেন রোকেয়ার স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর স্বপ্নের চেয়েও অনেক বেশি অগ্রগামী। যেমন উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি, ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও স্বপ্ন বুনছেন। তিনি ইতোমধ্যে ২০২১ সালের রূপকল্প, ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ এবং ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান তৈরি করেছেন। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে? কেমন করে এগিয়ে যাবে? কেমন করে নেতৃত্ব দেবে? তিনি সে স্বপ্ন রচনা করে যাচ্ছেন। পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দিয়েছেন বাস্তবায়নের জন্য। একুশ শতকের বাংলাদেশকে তুলে দিয়েছেন আগামীর প্রজন্মের হাতে। সবকিছু মিলিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর পূর্বসূরী স্বপ্নদ্রষ্টা বেগম রোকেয়ার কাছে আমরা আজীবনের জন্য ঋণী হয়ে রইলাম।
n লেখক : সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়
