নারী উন্নয়নে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:১০

কোনো দেশের উন্নয়নের জন্য নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এ সময়কাল অবধি নারী উন্নয়নের ধারাটি যদি লক্ষ্য করা যায় তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের নারীরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। উন্নয়নের মূলধারাতেই ঘটেছে এ অগ্রগতি। তবে যতটা প্রত্যাশিত ছিল, ততটা ঘটেনি। কখনও বিভ্রান্তিকর রাষ্ট্রীয় নীতিমালা গ্রহণ, কখনও নীতিমালা প্রণয়ন বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয়ে সৃষ্টি করেছে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতার। যার সূত্র ধরে নানা কারণে নারী উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে।

নারী উন্নয়নের বাধার পথে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়, দারিদ্র্যের স্থান তার শীর্ষে। নারী উন্নয়নের প্রধান বাধাই হচ্ছে দারিদ্র্য। নারী উন্নয়নের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হচ্ছে নারী শিক্ষা ও নারীর প্রশিক্ষণ। শুধু শিক্ষা নয়, দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের নারীরা আরেকটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে তারা; আর সেটা হলো স্বাস্থ্য। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে নারী উন্নয়নের পথে আরেকটি বড় বাধা। পুরুষতন্ত্র উগ্র হয়ে উঠলেই এ সহিংসতা দেখা দেয়। বাংলাদেশের পশ্চাদপদ পুরুষতান্ত্রিক মুসলিম সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত হয়ে আসছে। নারীরা যেমন ঘরে নিরাপদ নয় তেমনি বাইরেও নয়। কারণ নারীর প্রতি সহিংসতার হার বৃদ্ধিসহ নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে উত্ত্যক্তকরণ। এই নিগ্রহের ফলে সমাজে নারীর প্রতি প্রতিনিয়ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। ফলে স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নারীর সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে।

নারী উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার নারীর উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। রাজনীতি, খেলাধুলা, কৃষি, শিক্ষা, করপোরেশন, শোবিজ সবখানে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। খেলাধুলার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই। ২০০৬ সালে প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় নারী দল গঠনের পর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের সঙ্গে খেলা হয়। ২০১৪-২০১৭ সালে বাংলাদেশ নারী ফুটবলের অনেকগুলো অর্জন রয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল দল সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হয়। এর আগে ভারতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল রানারআপ হয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৫৪ হাজার জনবলের ২৮ হাজার নারী। তৃণমূল পর্যায়ে ২৩ হাজার পরিবার পরিকল্পনা সহকারী এবং সাড়ে ৪ হাজার পরিদর্শিকা নিরাপদ প্রসবসেবা নিশ্চিতের জন্য কাজ করছেন। আইএলও (ILO) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট এক কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে ৭৪ শতাংশ অর্থাত্ প্রায় ৯২ লাখ নারীই কৃষি কাজ, মত্স্য চাষ ও সামাজিক বনায়নের সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া বাংলাদেশ নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, জাতীয় সংসদে নির্বাচিত ২২ জন নারী সাংসদ রয়েছেন। নারীদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি উপজেলায় একজন করে নারী ভাইস চেয়ারম্যান এবং সংরক্ষিত আসনে তিনজন করে সদস্য রয়েছেন।

নারী উন্নয়নের মাঝেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে নারীর শিকার হচ্ছে নানা ধরনের বাধার। নারী পাচার, পতিতাবৃত্তি, নারীর শোষণ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ও সমাজ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নারীরা। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ এখনো নারী-পুরুষের বৈষম্যের বিষয়ে তেমন একটা সচেতন নন। শিক্ষার অভাবে অনেক মায়ের মধ্যে এ সচেতনতা তেমন একটা দেখা যায় না। তারা ছেলেদের প্রতি একটু বেশি দুর্বল হয়ে থাকেন। পরিবারে যেকোনো ক্ষেত্রেই ছেলেরা একটু বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এ প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন সামাজিক সংস্কার। মেয়েদের মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাদের মেধা, প্রতিভা ও কর্মক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। স্বীকৃতি দিতে হবে সব ভালো কাজের। কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষের বৈষম্য ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে সমান তালে। তাছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যথাযথ পদক্ষেপ ও সকলের সচেতনতার মাধ্যমে এ বৈষম্য থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অনেকটা সম্ভব।

n লেখক:শিক্ষার্থী, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর

ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া, গাজীপুর