আবদুল মান্নান
গত কয়েক মাস ধরে দেশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে বলতেই হবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা হলেও শঙ্কিত না হয়ে পারা যাচ্ছে না। যদি বলি না, তেমন কোনো আলামত পাওয়া যাচ্ছে না, তা হলে পুরোপুরি সত্য বলা হবে না। শুরুটা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ইউরোপে কর্তব্যরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের সম্মেলনে ভাষণ ও নিজের চোখের চিকিত্সার জন্য লন্ডন যাওয়ার সময় হতে। তখন হঠাত্ করে পদ্মা সেতুতে নরবলির গুজব ছড়িয়ে বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাড্ডায় এক স্কুলছাত্রের মাকে হত্যা। তারপর হঠাত্ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে একজন প্রিয়া সাহার আবির্ভাব হলো যিনি খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে গিয়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিচারে নির্যাতন হচ্ছে, তাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নালিশ করলেন। পরে জানা গেল শুধু প্রিয়া সাহাই নয়, রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহও সেখানে হাজির ছিল। সেখানে হয় সে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে অথবা কোনো ধরনের ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে হাজির ছিল। অবৈধভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া কোনো সমস্যা নয়। শত শত রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি সেজে কর্মরত আছে ও অনেকেই নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। শুধু পাসপোর্ট নয়, অসংখ্য রোহিঙ্গা সরকারি কর্মচারীদের সহায়তায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্মার্ট কার্ড নিয়ে বেশ বহাল তবিয়তে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। এই সংখ্যা ত্রিশ হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কদিন আগে দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা ডাকাত নুর মোহাম্মদ পুলিশের হাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে তার কাছেও স্মার্ট কার্ড পাওয়া যায়, যা সে নির্বাচন কমিশন হতে সংগ্রহ করেছিল।
এই সবের জের না কাটতেই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের লাগামহীন দুর্নীতির খবর দেশের গণমাধ্যমের কল্যাণে মানুষ জানতে পারে। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি নতুন কোনো সংবাদ নয়। অবশ্য ব্যতিক্রম তো আছেই। কিন্তু যখন দেখা যায় কোনো কর্মচারী ৪০ হাজার টাকার বেতন পেয়ে ঢাকায় একাধিক বাড়ি বা মার্কেটের মালিক অথবা মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিদেশে বাড়ি ক্রয় করে, তখন তা অবশ্যই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হলো—সরকারের দায়িত্বশীল পদে থাকা বেশ কিছু ব্যক্তির দায়িত্বহীন উক্তি। তবে সবচেয়ে উত্কণ্ঠার বিষয় হচ্ছে—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনা বাংলাদেশ সচিবালয়ে, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকে, তাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অফিস ছুটির পর মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিজেরা সচিব সেজে চাকরি দেওয়ার নাম করে অনেক চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে বেশ বড়ো অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ৩রা সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে—দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকে এক শ্রেণির বহিরাগত প্রতারক নিজেদের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পরিচয় দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নাটক সাজিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, ভুয়া নিয়োগপত্র দিচ্ছে। এমনকি ভুয়া পুলিশ ভেরিফিকেশনও হচ্ছে। এই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেক মানুষ নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছে। মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে—দেশটা চোর, বাটপার, প্রতারক ও ফেরেববাজে ভরে গেছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এতসব দিকে নজর দেওয়া অসম্ভব।
জুনের ৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে আসার পরও পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। এটি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, দেশে কোনো সমস্যা বা সংকট সৃষ্টি হলে তার সমাধানের জন্য সবাই প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন, যদিও দেশে কয়েক ডজন মন্ত্রী আর অসংখ্য উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী আছেন। এর ফলে একজন প্রধানমন্ত্রীর ওপর যে অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ে তা কেউ অস্বীকার করবেন না। তাই তো শেখ হাসিনা প্রায়শ বলে থাকেন তিনি রাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সময় পান না। এই বয়সে এটি তার প্রতি মারাত্মক অবিচার। তিনি দেশে ফেরার পর পরই প্রথমে শুরু হলো—সারাদেশে মহামারি আকারে ডেঙ্গুর প্রভাব। প্রতিদিন শত শত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শুরু হলো। প্রথমে ঢাকা, তারপর চট্টগ্রাম, এরপর সারাদেশে। গত একমাসে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর রেশ না কাটতেই যে সমস্যাটি আয়ত্তের বাইরে চলে গেল, তা হচ্ছে কোরবানির চামড়া কেনাবেচা নিয়ে এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। কোরবানির চামড়া কেনাবেচার এত খারাপ অবস্থা নিকট অতীতে দেখা যায়নি। চামড়া শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, যেমনটি হয়েছে পাটের ক্ষেত্রে। এরই মধ্যে ঘটে গেল আর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। গত ২২ আগস্ট দেশের শীর্ষ আদালতের তিন জন বিচারপতিকে অনিয়মের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সাসপেন্ড করে। দেশের মানুষ মনে করে, ন্যায়বিচারের জন্য তাদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল দেশের আদালত। এই দফায় বিচারালয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করা শুরু করেছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। বর্তমানে তিনি দুর্নীতির দায় কাঁধে নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিচারপতিরা নানা কারণে সমালোচিত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ জমির ১৯৫৫ সালে সেই দেশের বড়ো লাট গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক পাকিস্তান গণপরিষদ ভেঙে দেওয়াকে বৈধ বলে ঘোষণা করে এখনো নিন্দিত। অথচ সিন্দু হাইকোর্ট এই ভেঙে দেওয়াকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছিল। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করলে সেই একই বিচারপতি জমির তা-ও বৈধ বলে ঘোষণা করেন। ভারতে ১৯৭১ সালের পঞ্চম লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী রাজনারায়ণকে হারিয়ে বিজয়লাভ করলে রাজনারায়ণ এলাহাবাদ হাইকোর্টে তাকে ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হারিয়ে দিয়েছেন বলে মামলা করেন। সেই মামলায় রাজনারায়ণের পক্ষে নিষ্পত্তি হয় ১৯৭৫ সালে। এর ফলে ভারতে এক মারাত্মক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। ইন্দিরা গান্ধী বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য সাংবিধানিক পথে না গিয়ে দেশে জরুরি আইন জারি করেন এবং তার বৈধতা দিতে নির্বাহী আদেশবলে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারা পরিবর্তন করা হয়। বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে উত্থাপিত হলে নানা নাটকীয়তার পর আদালত ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে ১৯৭৫ সালে রায় দেন এবং এই রায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বিচারপতি চন্দ্রচূড়। ২০০৩ সালে এক অনুষ্ঠানে মুম্বাইয়ে আমার সঙ্গে বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের দেখা হলে এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা নিয়ে কোনো আলোচনা করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
গত ২৫ তারিখ বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের নাগরিক কয়েক লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে জড়ো হয়ে তাদের দেশে না ফেরার ঘোষণা দিয়েছে এবং সরাসরি বাংলাদেশ সরকারকে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। গত কয়েক দিনে দেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রোহিঙ্গাবিষয়ক সংবাদ বিশ্লেষণ করলে এটা পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে ইতিমধ্যে রোহিঙ্গারা টেকনাফ, উখিয়া, কুতুপালং আশ্রয়শিবিরকে কেন্দ্র করে একটি ভার্চুয়াল স্বশাসিত এলাকা প্রতিষ্ঠা করেছে। এদিকে গত শনিবার রাতে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে একজন মন্ত্রীর পুলিশ এস্কর্ট গাড়িতে দূরনিয়ন্ত্রিত বোমার মাধ্যমে হামলা করলে দুজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন নজরদারি সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এক টুইট বার্তায় জানায়, আইএস এ হামলা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যথার্থই বলেছেন, এ হামলা ভবিষ্যতে কোনো এক বড়ো ধরনের হামলার মহড়া হতে পারে। টার্গেট হতে পারেন কোনো মন্ত্রী অথবা সংসদ সদস্য অথবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। গত পাঁচ মাসে এ ধরনের পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যম পুলিশের বরাত দিয়ে খবর দিচ্ছে, দেশে জেএমবি ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠী আবার সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে জঙ্গি সংগঠন ‘আল্লাহর দল’-এর কয়েকজন সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে। গত কয়েক বছর ধরে দেখছি, ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোড ও তত্সংলগ্ন এলাকায় নিয়মিত বিরতি দিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরির বেশ বড়ো বড়ো পোস্টার লাগিয়ে বর্তমান সরকারকে উত্খাত করে খেলাফত প্রতিষ্ঠার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। কখনো কখনো এলাকার মসজিদে মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজের পর কয়েক ভাঁজ করে তাদের লিফলেটও বিলি করছে। এসবের মধ্যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু দুর্বৃত্ত নিয়মিত হানাহানিতে লিপ্ত রয়েছে, যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এসব ঘটনা-দুর্ঘটনা দেশের সাধারণ মানুষকে অবশ্যই বিচলিত করে। এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন প্রয়োজন, কারণ তা না হলে ঘটে যেতে পারে আরো বড়ো ধরনের কোনো অঘটন।
n লেখক :বিশ্লেষক ও গবেষক
