শতবছরের এসডিও বাংলো

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:২৬

নিজাম উদ্দিন লাভলু, রামগড়

 

এপারে সাবেক মহকুমা রামগড় আর ওপারে ভারতের ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমা। মাঝখানে ফেনী নদী। দু-দেশের এ সীমানা নদীর কূল ঘেঁষে প্রকৃতির অপরূপ পরিবেশে প্রাচীন দৃষ্টিনন্দন মহকুমা প্রশাসক বাংলো বা এসডিও বাংলোটির অবস্থান। এটি রামগড়ের শতবছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের নির্দশন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা। এক কথায় বাংলোটি এখন কালের সাক্ষী ।

১৯৮২-৮৩ সাল পর্যন্ত  থানা ও জেলার মাঝখানে ‘মহকুমা’ নামে একটি প্রশাসনিক ইউনিট বা স্তর চালু ছিল। ১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকার রামগড় থানাকে তত্কালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার (জেলা সদর ছিল রাঙ্গামাটি) দ্বিতীয় মহকুমা হিসেবে উন্নীত করে। এর ১-২ বছর আগেই রামগড় থানা সদরে ফেনী নদীর কূল ঘেঁষে নির্মাণ করা হয় মহকুমা প্রশাসকের অফিস ও বাসভবন। ব্রিটিশ প্যাটার্ণে বিশেষ নির্মাণশৈলীতে বানানো  হয় এসডিও সাহেবের বাংলোটি। ৩ হাজার ৪৬৫ বর্গফুটের বিশাল এ বাংলো তৈরি করা হয় মাচান ঘরের আদলে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতা ও ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ইটের তৈরি শতাধিক পিলারের ওপর মোটা ও শক্ত কাঠের চৌকাঠ স্থাপন করা হয়। এর ওপর কাঠের চিড়াই তক্তা বিছিয়ে ফ্লোর বা মেজ বানানো হয়। ৬৩০ বর্গফুটের বারান্দাসহ এভাবে কাঠ বিছিয়ে তৈরি করা ৩ হাজার ৪৬৫ বর্গফুট ফ্লোরের ওপর শক্ত ও মোটা কাঠের খুঁটি স্থাপন করে নির্মাণ করা হয় বিশাল বাংলোটি। বাঁশের বেড়ার ওপর বালু সিমেন্টের আস্তর বা প্লাস্টার করে তৈরি করা হয় বাংলোর ভেতর বাইরের সবগুলো দেয়াল। কাঠের ফ্লোর থেকে এ দেয়ালের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। বাঁশের দেয়ালের প্লাস্টারে চুনের সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। শতবছরের এ বাঁশের দেয়াল ও চিরাই কাঠের ফ্লোর বা মেজ এখনো অক্ষত। টিনের ছাউনির এ মাচান বাংলোয় ওঠানামার জন্য  সামনে একটি বড় ও প্রশস্ত আরসিসি সিঁড়ি ছাড়াও পেছনে ছোট আকারের ৪টি এবং পশ্চিম পাশে দুটি সিঁড়ি রয়েছে। জানা যায়, রামগড়ের আশেপাশের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয় বাংলো নির্মাণ কাজে ব্যবহূত জারুল, গর্জন ইত্যাদি কাঠ ও বাঁশ। চাঁদপুরের হাজিগঞ্জ থেকে করাতিদের এখানে এনে কাঠ চিরাইয়ের কাজ করানো হয়। লালু প্রসাদ বাবু নামে এক ঠিকাদার বাংলোর কাজ করেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডু থেকে ধুমঘাট হয়ে ফেনী নদীপথে আনা হয় ইট, চুন ইত্যাদি নির্মাণ সামগ্রী। নির্মাণ কাজের শ্রমিকদের সর্দার ছিলেন পঞ্চ কুমার ত্রিপুরা। ব্রিটিশ সরকারের এক সিনিয়র মেম সাহেব কাজকর্ম দেখতে চট্টগ্রাম থেকে ধুমঘাট হয়ে নদীপথে রামগড়ে আসতেন মাঝেমধ্যে।  ১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সরকারের এক আদেশে মহকুমা সদর রামগড় থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে মহালছড়ি থানার খাগড়াছড়ি ইউনিয়নে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রামগড় সংযুক্ত খাগড়াছড়ি মহকুমা নামে সেখানে কার্যক্রম চালু হয়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মহকুমা সদর রামগড়ে পুনঃস্থাপন করা হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে এসডিও বাংলোটিতে।  ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পাকবাহিনী রাঙ্গামাটি দখল করার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা সদর সেখান থেকে রামগড়ে স্থানান্তর করে নিয়ে আসা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তত্কালীন ডিসি এইচ টি ইমাম এ বাংলোতে অবস্থান করতেন। ১৯৭১ সালের ২ মে রামগড় পতন পর্যন্ত এখান থেকে তিনি স্বাধীনবাংলা সরকারের অধীনে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি পাকবাহিনীর হাতে আক্রান্ত হওয়ার পর বেতার কেন্দ্রের ১ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন ট্রান্সমিটারটি রামগড়ে নিয়ে আসেন সেখানকার কয়েকজন যুবক। এসডিও বাংলোতে ট্রান্সমিটারটি বসিয়ে সেখান থেকে কিছুদিন সম্প্রচার করা হয় স্বাধীনবাংলা বেতারের অনুষ্ঠান।

১৯৮৩ সালে রামগড় মহকুমাকে উপজেলায় অবনমিত করার পর মহকুমা প্রশাসন বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে প্রাচীন ঐতিহ্য এসডিও অফিস ও এসডিও বাংলোটি। যতদূর জানা যায়, আশির দশকে পুরোনো এসডিও অফিস এলাকায় তত্কালীন বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) ব্যাটেলিয়ন সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহূত হয়। এসডিও বাংলোটি বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করতেন বিডিআর অধিনায়ক। আশির দশকের শেষার্ধে ব্যাটেলিয়ন সদর তৈচালাপাড়ায় স্থানান্তরিত করা হয়। ফলে আবারো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে প্রাচীন এসডিও বাংলো ও অফিস ভবন। নব্বই দশকের শেষে এসডিও অফিসটিতে বিডিআরের একটি বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। কিন্তু পরিত্যক্ত থেকে যায় এসডিও বাংলোটি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঐতিহ্যবাহী বাংলোটি। ১৯৯৬ সালে বাংলোতে দুটি সরকারি অফিস চালুর পর এটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাংলোর পশ্চিম অংশে ইট, চুন, সুরকি দিয়ে তৈরি করা ছোট ছোট ঘরগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন শুধু ঘরগুলোর ধ্বংসাবশেষ সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।