সালেহ আহমেদ
বঙ্গবন্ধু কণ্ঠ হিসেবে খ্যাত ছাত্রজীবন থেকে অনলবর্ষী বক্তা, সময়ের প্রয়োজনে যিনি নীতিনিষ্ঠতার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন; শোষণমুক্ত, অগ্রসর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আপসহীন ব্যক্তিত্ব, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য, ছয় দশকের বেশি সময় থেকে যিনি দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামনের সারিতে অবস্থান নিয়ে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রগতির ধারায় মানুষকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন—গত ৬ আগস্ট সেই জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য জন্মের ৮০তম বছরে পদার্পণ করলেন।
খুবই দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনতার, আজকের প্রজন্মের কাছে দীর্ঘ রক্তাক্ত লড়াইয়ের ইতিহাস এখন অসার ও ম্লান হতে চলেছে। এই বাস্তবতাকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন বৈরিতা ও সাম্প্রদায়িকতার বাতাবরণ প্রবাহিত হচ্ছে। নীতিহীনতা ও গণবিমুখ ধান্ধাবাজদের দৌরাত্ম্যে দেশের মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে আশার আলো খুঁজে বেড়াচ্ছে। ব্যক্তিজীবনের সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে গরিব মেহনতি, কৃষক-শ্রমিক, সংখ্যালঘু-আদিবাসী, নারী-শিশুসহ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, ইতিহাসের দায়বদ্ধতা নিয়ে এখনো দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান, প্রচারবিমুখ ও অগ্রসর চিন্তার এমন একজন পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক হলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রসৈনিক জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য, জন্ম চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে ১৯৩৯ সালের ৬ আগস্ট। দুই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের জন্ম এই গ্রামে। যাদের একজন অগ্নিযুগের বিপ্লবী ‘মাস্টারদা সূর্য সেন’ ও অন্যজন মহাকবি ‘নবীনচন্দ্র সেন’। পিতামহ রমেশ ভট্টাচার্য ছিলেন ব্রিটিশ আমলের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজসংস্কারক। পিতা প্রফুল্লকুমার ভট্টাচার্য একজন আত্মনিবেদিত শিক্ষাব্রতী আর মাতা মণিকুন্তলা দেবী স্বদেশি ও প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মাতৃসম ও সুখ-দুঃখের আশ্রয়স্থল। পঙ্কজ ভট্টাচার্য মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গড়ে ওঠা যুগান্তর ও অনুশীলন নামক সংগঠনের ছায়াতলে বেড়ে ওঠেন।
আগরতলা মামলার কয়েক মাস আগে স্বৈরাচার আইয়ুব-ইয়াহিয়ার নীলনকশায় ১৯৬৭ সালে স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলায় পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আগরতলা মামলায় যুক্ত করার পরিকল্পনাও করা হয়, কিন্তু পাকিস্তানের ন্যাপ এই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়বে বিবেচনায় স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলায় একক আসামি হিসেবে তাকে কারাগারে তিন মাসের বেশি সময় থাকতে হয়। আগরতলা মামলার পরিসমাপ্তির পর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ থেকে স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলাও প্রত্যাহার করা হয়। উল্লেখ্য, স্বৈরাচার আইয়ুব-ইয়াহিয়ার সময়ে সাড়ে চার বছরের বেশি সময় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয় পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে।
ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে বিভিন্ন সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। ১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে ঐ সময়ে মানুষকে সংগঠিত করা, মুক্তির সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব কৃতিত্বের সঙ্গে পালন করেন। বিশ্বরাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার পট পরিবর্তনের জটিল পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ধারার আন্দোলনে অনেক প্রশ্ন ও মূল্যায়নে মেরুকরণের ফলে আমাদের দেশের বাম প্রগতিশীল রাজনীতিতে ও সম্ভাবনা ও কৌশলের বিষয় বিবেচনা নিয়ে জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য মানবমুক্তির নতুন দিগন্তের সন্ধানে অনুপ্রাণিত হয়ে সমমনা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, শ্রেণি-পেশার মানুষদের নিয়ে জাতীয় কনভেনশনে মিলিত হয়ে গঠন করেন নতুন রাজনৈতিক দল গণফোরাম। সময়ের ব্যবধানে গণফোরামের কর্মসূচি দেশবাসীর কাছে সমাদৃত হলেও নেতৃত্বের কৌশল ও লক্ষ্যহীনতার কারণে গণফোরাম জনভিত্তি অর্জনে সক্ষম হয়ে ওঠেনি। পরবর্তীতে জাতীয় প্রয়োজনে গণফোরাম নিয়ে পথচলা ও সফলতার সম্ভাবনা না থাকায় সময়ের বাস্তবতায় পঙ্কজ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ঐক্য ন্যাপ গঠিত হয়। তিনি ঐক্য ন্যাপের সভাপতি হিসেবে এখনো জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকায় রয়েছেন। পাশাপাশি ১৯৯৭ সালে কমরেড অজয় রায় (প্রয়াত), জাতীয় নেতা কাজী আরেফ আহমেদ (প্রয়াত), পীর হবিবুর রহমান (প্রয়াত), বিধান কৃষ্ণ সেন (প্রয়াত), ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, অধ্যাপক ড. অজয় রায়, অধ্যাপক ড. হায়াত্ মামুদ, জিয়াউদ্দিন তারেক আলীসহ (বর্তমান সভাপতি) জাতীয় ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পঙ্কজ ভট্টাচার্য সময়ের দাবিতে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’ এবং ২০১০ সালে ২৮টি শ্রেণি-পেশার সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে তোলেন ‘সাম্প্রদায়িকতা জঙ্গিবাদ বিরোধী মঞ্চ’। একইসঙ্গে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাম্প্রদায়িকতা জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।
৮০ বছর পার করা এই মানুষটি এখন নানান ধরনের সীমাবদ্ধতা, শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে জাতীয় সংকট মোকাবিলা ও সংগঠনের কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবিরাম ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু আদিবাসীসহ সমাজের নিপীড়িত মানুষের পাশে তিনি হাজির হন। তাদের যে কোনো বিপদে-আপদে সংগঠিত করেন এবং প্রতিবাদ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশের নানান উত্থান-পতনের সাক্ষ্য বহন করে, এখনো তিনি মানুষের ওপর আস্থাশীল। মানবমুক্তির লড়াইয়ে সদা সক্রিয় রয়েছেন এখনো। বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রিত্বের প্রলোভন ও লোভ-লালসার প্রস্তাব বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে অদ্যাবধি নিজের বিশ্বাসের প্রতি আস্থাশীল থেকে পথ চলছেন। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে একজন ছাত্রকর্মী হিসেবে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের সান্নিধ্যে আসার পর থেকে যে বিষয়গুলো তার কর্মময় জীবনে লক্ষ করছি তা বর্ণনা করে শেষ করা খুবই কঠিন। সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক হিসেবে প্রতিদিন সকাল-বিকাল অফিসে আসা, কাজ পাগল, দেশ পাগল, কর্মীবান্ধব নিবেদিত মানুষটি এখনো নিজের বিশ্বাসের প্রতি-দৃঢ় আস্থাশীল ও আশাবাদী। সংগঠনের নেতাকর্মীদের যে কোনো সংকটে তাকে উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত করে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা সহকর্মী ও নিরীহ জনসাধারণের সমস্যার কথা শুনে তিনি প্রয়োজনীয় বুদ্ধি, পরামর্শের পাশাপাশি প্রশাসনিক সহায়তার ক্ষেত্রে ও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে থাকেন। মূলত রাজনৈতিক নেতার পাশাপাশি একজন সমাজকর্মী ও মানবপ্রেমী জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য। ব্যস্ততার মাঝেও তিনি বিভিন্ন দৈনিকে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংকট নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর লেখা ‘দুর্মুখের দরবার’ গ্রন্থটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে অনেকের। আত্মকথনমূলক গ্রন্থ ‘আপনহারা দিনগুলি’, জীবনী গ্রন্থ ‘পীর হবিবুর রহমান এবং তার সময়’ বরণীয় স্মরণীয় ব্যক্তিদের নিয়ে লেখা ‘জীবন থেকে পাঠ’ প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যে। প্রকাশের পথে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেন্দ্রিক ‘ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী এবং উচ্চ আদালতের রায়’, লোকনায়ক ‘মওলানা আহমেদুর রহমান আজমী’ প্রভৃতি।
বর্তমান সময়ে দেশে মানবপ্রেমিক ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই অবস্থার মধ্যেও হাতেগোনা দু-চারজন ত্যাগী, একনিষ্ঠ আদর্শবাদী রাজনীতিবিদ পাওয়া যায় তাদের অন্যতম সংগ্রামী জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য।
রাজনীতির এ মানুষটি সর্বদা লালন করেন মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতবোধ। রাজনীতি ও সমাজকর্মের ব্যস্ততার মধ্যে বিগত প্রায় ছয়-সাত বছর থেকে নানা ধরনের জটিল রোগে ভুগতে হচ্ছে তাকে। মাঝেমধ্যে হাসপাতাল বা ডাক্তারের শরণাপন্ন হন তিনি। ব্যক্তিজীবনে তার সহধর্মিণী রাখীদাস পুরকায়স্থ একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। অবসর নিয়ে এখন সুপ্রতিষ্ঠিত আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। পঙ্কজ ভট্টাচার্য জাতীয় নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে রাখীদাস সর্বদা সাহস, উত্সাহ ও সহযোগিতা দিয়েছেন অকুণ্ঠভাবে। নিঃসন্তান এ দম্পতি এখনো রয়েছেন সমাজ-সভ্যতার অগ্রসর সৈনিক হিসেবে সক্রিয়।
n লেখক :সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন ও সাবেক ছাত্রনেতা
