তালেব রানা
জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশ, মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে মানুষের আগ্রহ ও প্রচেষ্টা বেড়েছে। পৃথিবীর বাইরে একের পর এক গ্রহ, উপগ্রহ আবিষ্কার করে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদে মানুষের পা পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো-১১ ছিল প্রথম মনুষ্যবাহী মহাকাশ অভিযান, যা চাঁদে অবতরণ করে। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই এই অভিযানের সূচনা হয়। ঐ বছরের ২০ জুলাই নীল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে পা রাখেন। এই অভিযানে অংশ নেন দলের প্রধান নীল আর্মস্ট্রং, কমান্ড মডিউল চালক মাইকেল কলিন্স এবং চন্দ্র অবতরণ যানের চালক এডুইন অল্ড্রিন জুনিয়র। চন্দ্র জয়ের পর আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, একজন মানুষের জন্য এটি একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ, কিন্তু গোটা মানবজাতির জন্য এটি একটি বিশাল অগ্রযাত্রা।
আর্মস্ট্রংদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এখনো চাঁদের বিভিন্ন রহস্য উন্মোচনে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বিজ্ঞানীরা। ২০০৮ সালে ভারত চন্দ্রযান-১ নামে একটি রকেট পাঠিয়েছিল, যেটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানির কণার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ জুলাই ভারতের চন্দ্রযান-২ উেক্ষপণ করা হয়। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা আশা করছিলেন, চন্দ্রযান-২ তাদের সেই আবিষ্কারকে আরো একধাপ এগিয়ে নেবে। চাঁদের দক্ষিণ মেরু সূর্যের কাছ থেকে আড়াল থাকে বলে সেখানে তাপমাত্রা কম এবং সেখানে পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এই রকেটের তিনটি ভাগ রয়েছে। এগুলো হলো:একটি অরবিটার, অবতরণযান বিক্রম এবং প্রজ্ঞান নামে ছয় চাকার একটি রোবটচালিত গাড়ি। এর লক্ষ্য ছিল চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করা। সবকিছুই ঠিক ছিল। শুক্রবার মধ্যরাতে চাঁদের বুকে নামার কথা ছিল অবতরণযান বিক্রমের। কিন্তু চাঁদে নামতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে বিক্রমের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অপারেশনের একবারে শেষ পর্যায়ে চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দূরে ছিল চন্দ্রযান-২। তখনই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অনেকেই এটিকে দেশটির মহাকাশ অভিযানের ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদের মাটিতে নামতে গিয়ে অবতরণকারী যান ‘বিক্রম’-এর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, পুরো অভিযানটি ব্যর্থ হয়েছে।
কলকাতার বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সাবেক প্রধান ও মহাকাশবিদ ড. বি পি দুয়ারির মতে, চাঁদ প্রদক্ষিণকারী মহাকাশ যান, যার নাম চন্দ্রযান-২, সেটি এখনো চাঁদকে ঘিরে ঘুরছে। এই যানটি একসময় জানাতে পারবে যে, বিক্রমের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছে। এখন বিক্রমের অবস্থা কী, কিংবা কী ঘটেছে, সেটা এই মুহূর্তে কেউই বলতে পারছেন না। কারণ তার সঙ্গে কোনো রকম বেতার যোগাযোগ আর করা যায়নি। হয়তো যানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কম্পিউটারসহ তার যেসব অন-বোর্ড যন্ত্রপাতি আছে, সেগুলো হয়তো ঠিকমতো কাজ করেনি বলেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ইসরো) প্রধান কে সিভান জানান, বিক্রমের নামার সময় যেসব ডেটা পাওয়া গেছে সেগুলো এখন বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে গতকাল রবিবার ইসরো জানিয়েছে, চাঁদের পৃষ্ঠে খোঁজ মিলেছে অবতরণযান বিক্রমের। এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। ইসরো প্রধান আশার কথা শুনিয়ে বলেন, আমরা চাঁদের পৃষ্ঠে বিক্রম ল্যান্ডারের অবস্থান খুঁজে পেয়েছি। ল্যান্ডারের থার্মাল ইমেজ সংগ্রহ করেছে অরবিটার। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করা যায়নি। আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করছি। খুব দ্রুতই যোগাযোগ করা যাবে।
এই অভিযান পরিচালনা করতে ভারতের ব্যয় হয়েছে ১ হাজার কোটি রুপি। এই অর্থ এর আগে পরিচালিত যেকোনো দেশের চন্দ্রাভিযানের খরচের তুলনায় বহুগুণে কম। ইসরো বলছে, একই ধরনের অভিযানে মার্কিন সংস্থা নাসার ২০ গুণ বেশি অর্থ খরচ হয়ে থাকে। চন্দ্রযান-২-এর সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাস রচনার দিকে তাকিয়েছিল ভারত। চাঁদের পৃষ্ঠে ধীরে ধীরে অবতরণ করলেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের পরেই স্থান হতো ভারতের। পাশাপাশি প্রথমবারেই চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে অবতরণের রেকর্ডও ভারতের দখলে আসত। ইসরাইল গত এপ্রিলে ‘বেরেশিট’ নামে একটি মহাকাশযান চাঁদের বুকে নামানোর চেষ্টা করলেও সেটি ব্যর্থ হয়। নাসার রিপোর্ট বলছে, গত ৬০ বছরে পরিচালিত চন্দ্রাভিযানের ৪০ শতাংশই ব্যর্থ হয়েছে। তবে এখনই হাল ছাড়ছেন না ভারতের বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, চন্দ্রযান-২-এর অভিযান মাত্র পাঁচ শতাংশের মতো ব্যর্থ হয়েছে। ল্যান্ডার বিক্রমের সঙ্গে আগামী ১৪ দিন ধরে যোগাযোগের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে ইসরোর। ভারতীয়রা বলছে, তাদের জয় এখন মুলতুবি রয়েছে, তবে চন্দ্রযান-৩ অনেক বড়ো সাফল্য এনে দেবে।
