উন্নয়ন যখন বিপত্তি হয়ে দেখা দেয়

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১১

সামনেই পুজো। তার আগেই মেট্রোরেলের কাজে মধ্য কলকাতার বৌবাজার এলাকায় ভেঙে পড়তে শুরু করেছে একের পর এক বাড়ি। ফাটল ধরছে আরো বহু বাড়িতে। ঠিক এক বছর আগে দক্ষিণ শহরতলিতে ভেঙে পড়েছিল মাঝেরহাট ব্রিজ। সেটিও এখন প্রায় সেই অবস্থায়ই আছে। সব মিলিয়ে উত্সবের মৌসুমে শহর কলকাতা একটি খণ্ডহরের চেহারা দিয়েছে। সোনাপট্টি বলে পরিচিত বৌবাজার এলাকায় বেশ কিছু বাড়িতে রয়েছে গহনা তৈরির কারখানা। ফলে বাড়িতে সব সময়ই কিছু না কিছু সোনাদানা মজুত থাকত। সামনেই রয়েছে বিয়ের মৌসুম। ফলে বিয়ের গহনা টাকাপয়সা এবং অর্ডারি মাল—সব মিলিয়ে গৃহস্থবাড়িগুলোতে যা ছিল সবই চলে গিয়েছে ধ্বংসস্তূপের তলায়।

ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর কাজের জেরে বৌবাজারের বিপর্যয়ের গৃহহীনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত বুধবার সকালে সেকরাপাড়া লেনের আরো একটি বাড়ি ভেঙে পড়ে। পাশাপাশি গতকালই ঐ এলাকায় আরো ২০টি বাড়িকে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্গা পিথুরি লেন, সেকরাপাড়া লেনের পরে গতকাল পাশের গৌর দে লেনের কয়েকটি বাড়ি থেকেও কিছু বাসিন্দাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এলাকার আরো কয়েকটি বাড়িতে বড়ো বড়ো ফাটল লক্ষ করা গেছে। সব মিলিয়ে আতঙ্ক আর ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে বাসিন্দাদের মধ্যে।

গত তিন দিন ধরে লাগাতার বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করেও অন্যদের মতো ব্যর্থ হয়েছেন ১৪ নম্বর দুর্গা পিথুরি লেনের বাসিন্দা জয়ন্ত শীল। ভেতরের খানিকটা আগেই ভেঙে গিয়েছিল। গত মঙ্গলবার সকালে সাড়ে ৭টা নাগাদ চোখের সামনেই ভেঙে পড়ে গোটা বাড়িটা। আগামী জানুয়ারি মাসে মেয়ের বিয়ের গয়না, শাড়ি থেকে টাকা কাগজপত্র সবই চাপা পড়েছে ধ্বংসস্তূপের তলায়। দিশেহারা হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এদিকে গতকালও অনেকগুলি বাড়ি খালি করে বিভিন্ন হোটেলে পাঠানো হয়েছে বেশ কিছু বাসিন্দাকে। পুলিশ সূত্রে খবর, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত বিপর্যস্ত এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৪০০-র বেশি। নবান্নে বৈঠক থাকায় বাসিন্দাদের ক্ষোভ খানিকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সোনার দোকানদার, কারিগররা ব্যাপকভাবে ক্ষোভ দেখান।

গত মঙ্গলবার সকাল থেকে গোয়েঙ্কা কলেজের কন্ট্রোল রুমের সামনে পুলিশ, মেট্রো আধিকারিকরা ব্যস্ত ছিলেন নতুন করে কিছু ঘর খালি করে তাদের কোনো একটা হোটেলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে। রাস্তার পাশেই বসে ছিলেন দুর্গা পিথুরি লেনের বাসিন্দা মানসিক ভারসাম্যহীন এক মহিলা। তার এখনো পুনর্বসানের ব্যবস্থা হয়নি। স্থানীয় মানুষরাই তাকে খাবারদাবার দিয়েছেন। এদিকে মঙ্গলবার নবান্নের বৈঠকে ঘরের পরিবর্তে ঘর, দোকানের বদলে দোকান—সকলে সহমত হলে ৫২টি পরিবারকে পরিবারপিছু ৫ লাখ টাকা  এককালীন সাহায্য নিয়ে কিছুই জানায়নি মেট্রোরেল।

কলকাতা মেট্রো রেলওয়ে করপোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মানস সরকার জানান, বোর্ড মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত না হলে তিনি কিছুই বলতে পারছেন না। মেট্রোরেলের কাজে বৌবাজারে গতকাল পর্যন্ত সমস্ত বাড়িতে ফাটল দেখা গেছে, সেখানে ৫২টি পরিবারের ৩৯৮ জনকে বিভিন্ন হোটেলে স্থানান্তরিত করা হয়। বেশ কিছু দোকান, সোনা-রুপার কারিগরদের কাজের জায়গা ভেঙে গেছে। এই বিপর্যয় নিয়ে নবান্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠকে ছিলেন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব রাজ্য পুলিশের ডিজি, প্রাক্তন ডিজি, কলকাতার মেয়র, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, আরো কয়েকটি দপ্তরের সচিব, সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মেট্রোরেলের জিএম পিসি শর্মা, কলকাতা মেট্রো রেলওয়ে করপোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মানস সরকার প্রমুখ।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অনেকের মূল্যবান নথিপত্র সবই খোয়া গেছে। অনেকের ঘরের মধ্যে আটকে আছে। তারা ঘরে ঢুকতে চান। তারা পুলিশ এবং করপোরেশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ভেতরে ঢুকবেন। চুরির কোনো ভয় নেই। সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। যাদের নথিপত্র নেই, তারা কন্ট্রোলরুমে জানাবেন। রাজ্য সরকার বিকল্প নথিপত্র দিতে সাহায্য করবে।

আতঙ্ক কমার বদলে ক্রমেই বাড়ছে বৌবাজার এলাকায়। রবিবার সকাল থেকেই বাসিন্দারা বারবার ছুটে যাচ্ছেন নিজের বাড়ি কী অবস্থায় রয়েছে দেখার জন্য। নিজের বাড়ির পরিণতির কথা ভেবে গতকাল পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে উত্কণ্ঠায় জ্ঞান হারালেন ১০/২ সেকরাপাড়া লেনের বাসিন্দা উমা গুপ্ত। মঙ্গলবার আশঙ্কা করেছিলেন। বুধবার ঘর ছাড়ার সেই আশঙ্কা সত্যি হলো বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের বাসিন্দা মৌমিতা ঘোষের। পুলিশ সূত্রের খবর, বুধবার বিকেল পর্যন্ত বউবাজারের ঘরছাড়া বাসিন্দাদের সংখ্যা পৌঁছল ৪৫০-এরও বেশি।

পুলিশের তৈরি করে রাখা ব্যারিকেডের সামনে গতকাল সময় যত এগিয়েছে ততই বেড়েছে উত্কণ্ঠিত মানুষদের ভিড়। সব হারাতে হবে—এই আশঙ্কা চেপে বসছে স্থানীয় ঘরছাড়া মানুষগুলোর মনে। পুলিশের কড়া নিরাপত্তায় দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে না বাড়িগুলি। গতকাল বেলা আড়াইটে নাগাদ বিক্ষোভ শুরু হয় মেট্রোকর্মীদের ঘিরে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাদের যেসব হোটেলে রাখা হয়েছে, সেখানে ঠিকমতো খাবার মিলছে না। সমস্যা আছে জলেরও। কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেন মেট্রোকর্মীরা। এর পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে ভেঙে পড়া বাড়ির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী।

কলকাতা মেট্রোরেল করপোরেশনের কর্তাদের দাবি, ধস ঠেকাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। সুড়ঙ্গ নির্মাণের  কাজের জন্য যাদের বাড়ি ভেঙে গেছে, তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। লিখিত চিঠি দিয়ে দায় স্বীকারও করে নেওয়া  হচ্ছে। ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত হবে বোর্ড মিটিংয়ে। চোখের সামনে হুড়মুড় করে একের পর এক বাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে কলকাতার ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো কর্তৃপক্ষের। নতুন করে বাড়ি ভাঙা ঠেকাতে এবং ধস বন্ধ করতে মরিয়া মেট্রো কর্তৃপক্ষ আরো দুজন আন্তর্জাতিক সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ এবং দুজন ভূতত্ত্ববিদের শরণাপন্ন হয়েছে। গতকাল ঐ বিশেষজ্ঞরা বৌবাজারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

দক্ষিণ আফ্রিতার পল ভেরল ছাড়াও ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর সুড়ঙ্গ বিপর্যয় সামলানোর কাজে নেমেছেন সিঙ্গাপুর থেকে আসা জন ব্রিজ ক্রিস্টোফার ও এন্ডিকেট। মাটির চরিত্র বুঝে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের সাহায্য করছেন মণীশ কুমার এবং পিচ্ছু মণি নামে দুই ভূতত্ত্ববিদ। বিপদের ইঙ্গিত প্রকট হতে শনিবার সন্ধ্যায় সুড়ঙ্গ খননের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। খুব তাড়াতাড়ি ঐ কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আপাতত  বৌবাজার সুড়ঙ্গের ওপরের ধসপ্রবণ মাটিকে স্থিতাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চায় মেট্রো কর্তৃপক্ষ। সেই জন্য ঐ সুড়ঙ্গের একটি নির্দিষ্ট অংশে মাটির চাপের সমতুল জলের  চাপ তৈরি করাই মেট্রো কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, স্থিতাবস্থা ফিরে আসার পরেই বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ জানার জন্য মেট্রো কর্তৃপক্ষ আরো নিবিড় অনুসন্ধানের কাজ শুরু করতে পারবে। বিপর্যয়ের মুখে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে কলকাতা হাইকোর্টে জানিয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো কর্তৃপক্ষ। প্রধান বিচারপতি থোট্টামিল ভাস্করণ নায়ার রাধাকৃষ্ণন ও বিচারপতি অভিজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে গতকাল এই কথা জানানো হয়েছে। ডিভিশন বেঞ্চ তার পরেই মেট্রো কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়, আদালতের অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের কাজ ফের শুরু করা যাবে না। বৌবাজারে পাতালরেলের সুড়ঙ্গ তৈরির সময় ধস নামার বিস্তারিত রিপোর্ট ১৬ ডিসেম্বর পেশ করতে হবে আদালতে।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সুড়ঙ্গ তৈরি করে মেট্রোর কাজ শুরু করার আগে পরিবেশগত ও ভৌগোলিক সমীক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ তুলে জনস্বার্থ মামলা করেছে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, কলকাতার মাটি নরম। পাতালরেলের কাজের জন্য এখানে যে ধরনের প্রযুক্তিগত সাবধানতা নেওয়া উচিত ছিল, তা নেওয়া হয়নি। মেট্রোর আইনজীবী জিষ্ণু সাহা ডিভিশন বেঞ্চে জানান, গঙ্গার তলায় বা ব্রেবোর্ন রোডে, বিবাদী বাগে সুড়ঙ্গ তৈরির সময় এমন বিপত্তি দেখা দেয়নি।

n লেখক :ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক