গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার আগেই যার খুদে বিমান চালাবার লাইসেন্স মিলেছিল, তিনি দুঃসাহসী বৈমানিক, বিশ্বসেরা নভোচারী, পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরে ৩,৮৪,৩৯৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেই রুপোর চাঁদে পা রাখা প্রথম মানুষ নিল আর্মস্ট্রং।
১৯৩০ সালের ৫ আগস্ট তার জন্ম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও’র ওয়াপাকোনেটায়। পিতা স্টেফান কনিগ আর্মস্ট্রং ও মাতা ভায়োলা লুইসার প্রথম সন্তান তিনি।
দুই ছেলে এরিক ও মার্ক, মেয়ে ক্যারেন এবং স্ত্রী জ্যানেট এলিজাবেথ শ্যারনকে নিয়ে ছিল তার সংসার। পরে তিনি ক্যারল নাইট নামে এক নারীকেও বিয়ে করেন।
মাত্র ছয় বছর বয়সে প্রথম বিমানে ওঠেন তিনি। আর ১৯৪৬-এর ৫ আগস্ট ১৬ বছর বয়সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শিখে ফেলেন বিমান চালানো। বয়স যখন ৩৫, তখন থেকে তার মহাকাশ অভিযান শুরু।
নিল আর্মস্ট্রং পারডু বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং ও অ্যারোস্পেস ইঞ্জিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর করেন। নভোচারী হওয়ার আগে মার্কিন বৈমানিক হয়ে কোরীয় যুদ্ধে অংশ নেন। ড্রাইডেল ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টারের পরীক্ষমূলক বিমান চালক হিসেবে ৯০০-এর অধিকবার উড্ডয়ন করেন। শুধু তা-ই নয়, বেল এক্স-১ বি নামের রকেটপ্লেন শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে চালানোর রেকর্ড গড়েন তিনি।
জেমিনি-৮ নভোযানের চালক হিসেবে আর্মস্ট্রংয়ের প্রথম মহাকাশ অভিযান ১৯৬৬-তে। এ অভিযানে তিনি ও ডেভিড স্কট মিলে সর্বপ্রথম দুটি ভিন্ন নভোযানকে মহাকাশে একত্রে যুক্ত করেন। আর দ্বিতীয় অভিযানটি তার ৩৮ বছর বয়সে। ১৯৬৯ সালে। সেই স্বপ্নের মহাকাশ মিশন। চাঁদে পা রাখার মিশন অ্যাপোলো-১১। যার কমান্ডার ছিলেন তিনি। ১৬ জুলাই অ্যাপোলো-১১ নভোযানে চড়েন তিনজন। নিল আর্মস্ট্রং এবং তার দুই সহকর্মী এডউইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। মহাকাশের ভয়াল পথ পাড়ি দিয়ে ২০ জুলাই তারা চাঁদে অবতরণ করেন। চাঁদের মাটিতে অবতরণের ৬ ঘণ্টা পর গ্রিনউইচ মান সময় ১২.৩৬ পিএম সর্বপ্রথম নভোযানের সিঁড়ি বেয়ে রুপোর চাঁদে পা রাখেন পৃথিবীর মানুষ নিল আর্মস্ট্রং। ২০ মিনিট পর চাঁদে নামেন এডউইন অলড্রিন। এসময় মাইকেল কলিন্স মূল নভোযানে অবস্থান করেন। ২.৫ ঘণ্টা সময় তারা স্বপ্নের চাঁদে ঘুরে বেড়ান। পৃথিবীর লাখো মানুষ প্রবল উচ্ছ্বাসে টেলিভিশনের সামনে বসে সরাসরি সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। চাঁদে পা রেখেই নিল বলেন, ‘এটা একজন মানুষের জন্য ক্ষুদ্র পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য বিরাট এক অগ্রগতি।’
২৪ জুলাই তিন নভোচারী ২৭.১ কিলোগ্রাম চাঁদের নুড়িপাথরসহ বিভিন্ন নমুনা সঙ্গে নিয়ে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। চাঁদ বিজয়ের আনন্দ-উত্তেজনায় নেচে ওঠে সমগ্র মানবজাতি। চাঁদ বিজয়ের অভিযানটিই ছিল আর্মস্ট্রংয়ের শেষ মহাকাশ অভিযান। নির্লোভ, নিভৃতচারী সত্ এই মানুষটির জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তাকে নিয়ে জেমস আর হ্যানসেনের লেখা ‘ফার্স্ট ম্যান’ নামে বিখ্যাত একটি জীবনীগ্রন্থ রয়েছে।
আমাদের জন্য আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে, এই জগেশ্রষ্ঠ নভোচারী নিল আর্মস্ট্রংসহ তিন চন্দ্র বিজয়ী ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ অক্টোবর বিকেলে ঢাকা এসেছিলেন। সেসময়ের ঢাকা এয়ারপোর্টে (বর্তমানে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর) অবতরণ করেন তারা। পরে তাদের মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়ে যাওয়া হয়।
২৫ আগস্ট, ২০১২ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ চলে যান নিল আর্মস্ট্রং। রেখে যান মানবজাতির জন্য চাঁদ বিজয়ের এক অসামান্য কীর্তি। আমরা যে আজ ভিনগ্রহে জীবনের অস্তিত্ব খুঁজি, পৃথিবীর বাইরে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখি, এসব চিন্তার শুরু ‘অ্যাপোলো ১১’-এর সাফল্য থেকেই। আর আর্মস্ট্রং হয়ে ওঠেন পৃথিবীর মানুষের কাছে সুপার হিরো। বলা যায়, তিনি মানবজাতির এক দুঃসাহসী মহানায়ক।
