ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে নয়া মোড়

শিখ তীর্থ যাত্রীদের জন্য করিডোর চালুর উদ্যোগ

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:৪৩

এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন এক যুগের

সাক্ষী হতে পারে ভারত-পাকিস্তান। এর

মধ্য দিয়ে কেবল কর্তারপুর গুরুদুয়ারার সঙ্গে ভারতের দেরা বাবা নানক গুরুদুয়ারার মধ্যে ৩ মাইল পথকেই সংযুক্ত করবে না বরং

এটি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের

পথ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে

এম এ আলআমিন

 

যখনই বিশ্বমঞ্চে ভারত-পাকিস্তানের নাম উচ্চারিত হয় দেশ দুটির সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে ‘চির বৈরী’, ‘চির প্রতিদ্বন্দ্বী’ ধর্মী নানা বিশেষণ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও চোখ থাকে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ইস্যু খুঁজতে। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে, দ্বিপাক্ষিক মতপার্থক্য পাশ কাটিয়ে প্রতিবেশীসুলভ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ভারত ও পাকিস্তান। শিখ তীর্থ যাত্রীদের জন্য ভিসামুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা চালু হতে যাচ্ছে ভারত-পাকিস্তান।

ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের নতুন সরকার সম্প্রতি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের নারোয়ালে করিডোর তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্প অবশ্য অনেক আগে থেকেই বিবেচনাধীন ছিল। দ্বিখণ্ডিত পাঞ্জাব প্রদেশের বেশিরভাগ পড়েছে ভারতে, একটি অংশ পাকিস্তানে। তিন মাইল দীর্ঘ করিডোরটি পাঞ্জাবের দুই অংশকে সংযুক্ত করবে। পাকিস্তান অংশের পাঞ্জাবে রয়েছে শিখদের ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুরুদুয়ারা দরবার সাহিব কর্তারপুর। করিডোরটি চালু হলে শিখরা ভারত থেকে পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়াই সেখানে যেতে পারবেন। দুটি বৈরী প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কর্তারপুর গুরুদুয়ারাটি শিখদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ভারতীয় অংশে রয়েছে দেরা বাবা নানক সাহিব গুরুদুয়ারা। বর্তমানে শিখরা তীর্থ করতে পাকিস্তানের সীমান্তের কাছে ভারতের ওই গুরুদুয়ারায় যান। সেখান থেকে বিশেষভাবে তৈরি মঞ্চ থেকে তারা বাইনোকুলার দিয়ে কর্তারপুর গুরুদুয়ারাটি প্রত্যক্ষ করেন।

জনশ্রুতি রয়েছে, শিখ ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক (১৪৬৯-১৫৩৯) জীবনের শেষ দিনগুলো কর্তারপুর গ্রামে কাটিয়েছিলেন। সেখানে  তিনি চাষবাস করেন। শিখ ধর্মীয় মতাদর্শগুলো তিনি সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান বিশ্বে আড়াই কোটির বেশি মানুষ তার অনুসারী। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। যে কারণে তার মৃত্যুর পর তাকে হিন্দু রীতি অনুযায়ী দাহ করা হবে না ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী দাফন করা হবে এ নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল। তার সমাধি ক্ষেত্রের উপরই কর্তারপুর গুরুদুয়ারা অবস্থিত। দুটি গুরুদুয়ারার মাঝখানে পাক-ভারত সীমান্ত এক অনতিক্রম্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২৮ নভেম্বর কর্তারপুর করিডোর প্রকল্প উদ্বোধন করেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ অবশ্য অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। ভারতের পক্ষ থেকে শুধু দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরসিমরত কউর বাদল, হরদীপ সিংহ ও পাঞ্জাবের মন্ত্রী নভোজিত্ সিং সিধু অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ইমরান এদিন বলেন, ‘৭০ বছর ধরে আমরা শুধু একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে এসেছি। ভারত আমাদের দিকে আঙুল তোলে, আমরা এলওসির (কাশ্মিরের লাইন অব কন্ট্রোল) ওপারের দিকে। দু’পক্ষেরই ভুল-ভ্রান্তি আছে।’ তিনি প্রশ্ন রাখেন আর কত দিন একে অন্যের প্রতি আঙুল তোলার খেলায় আমরা মেতে থাকব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা উভয়ই চাই কাশ্মির সমস্যার সমাধান হোক। মানুষ হিসেবে আমরা কি সেই সমস্যার সমাধান করতে পারি না? আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, এটা সম্ভব। আমাদের শুধু ইচ্ছা এবং স্বপ্ন থাকতে হবে।’ তিনি এ প্রসঙ্গে ফ্রান্স ও জার্মানির উদাহরণ তুলে ধরেন। এই করিডোর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন যুগের সূচনা করবে বলেও ইমরান আশা প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার আগে এ করিডোর দিয়ে শিখরা তীর্থে যেতে পারতেন।

আগামী বছর গুরু নানকের ৫৫০তম জন্মবার্ষিকী সামনে রেখে ওই করিডোর খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামাবাদ, ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের মন্ত্রী নভোজিত্ সিং সিধু একথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পাঞ্জাবের মানুষের কাছে এর চেয়ে বেশি আনন্দের কিছু হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ম থেকে রাজনীতিকে সরিয়ে তার এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের দূরত্ব কমাতে সাহায্য করবে। তীর্থ যাত্রায় সুযোগ পেলে আমিও শামিল হতে চাই। তিনি (ইমরান) আমার জীবন সার্থক করে দিয়েছেন।’

আশাবাদ সত্ত্বেও দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের আপাতত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে পূর্বনির্ধারিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক ভারত বাতিল করেছিল। কারণ হিসেবে নয়াদিল্লি কাশ্মিরের ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাকিস্তানের হামলার কথা উল্লেখ করে। ভারতের অভিযোগ, কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেওয়া বন্ধ করেনি পাকিস্তান। জাতিসংঘের ওই সম্মেলনেই ভারত ও পাকিস্তানকে একে অন্যের দিকে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে দেখা গিয়েছিল। কর্তারপুর প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে আমরা এই করিডোরের কথা পাকিস্তানকে বলে এসেছি। এই প্রথম তাতে সাড়া দিল পাকিস্তান। এতে আমি খুশি। কিন্তু তার মানে হয় যে এখনই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’ ইমরান যেদিন ওই করিডোরের কাজ উদ্বোধন করেন সেদিনই হায়দরাবাদে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সুষমা বলেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বন্ধ না করলে সার্ক সম্মেলনে যোগ দেবে না ভারত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন এক যুগের সাক্ষী হতে পারে ভারত-পাকিস্তান। এর মধ্য দিয়ে কেবল কর্তারপুর গুরুদুয়ারার সঙ্গে ভারতের দেরা বাবা নানক গুরুদুয়ারার মধ্যে ৩ মাইল পথকেই সংযুক্ত করবে না বরং এটি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে।