খুলনা অঞ্চলে বাগদা চিংড়ির উত্পাদন হ্রাস

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৩৩

অধিকাংশ চিংড়ি খামারির বাগদা চিংড়ি আবাদে লোকসান গুনতে হচ্ছে

এনামুল হক, খুলনা অফিস

প্রতিকূল আবহাওয়া ও মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টির কারণে চলতি মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে বাগদা চিংড়ির উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করায় চিংড়ি চাষি ও ডিপো মালিকরা গত মৌসুম থেকে চলতি মৌসুমে কম মূল্য পেয়েছে। ফলে অধিকাংশ চিংড়ি খামারিদের বাগদা আবাদে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাগদা চিংড়ি মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এপ্রিল ও মে মাসে রোগবালাই দেখা দেয়। বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেকটি চিংড়ির খামারে বড় আকারের মড়ক দেখা দেয়। সে কারণে চলতি মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে আশানুরূপ বাগদা চিংড়ির উত্পাদন হয়নি।

উপকূলবর্তী এলাকায় মার্চ মাস থেকে খামারগুলোতে চিংড়ি পোনা সরবরাহ করা হয়। গ্রীষ্ম মৌসুমে এ অঞ্চলে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে প্রথমদিকে খামারে রোগবালাই দেখা দেয়। এতে চিংড়ি চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার হেঞ্চী গ্রামের চিংড়ি চাষি হেমন্ত কুমার মণ্ডল জানান, তার ৯০ বিঘা জমিতে চিংড়ির খামারে উত্পাদন খরচ এবার ১০ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ৮ লাখ টাকা মূল্যের চিংড়ি বিক্রি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে খরার কারণে এবং পরবর্তীতে জুলাই মাসে অতিবৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা হেরফের হওয়ায় প্রথম চালানের দেড়লাখ চিংড়ির পোনা মারা যায়। এ উপজেলার পোড়াকাঠলা, গোয়ারসিং, যতিন্দ্রনগর, পালবাড়িয়া ও দুর্গকাঠি গ্রামে সারা মৌসুম ধরে চিংড়ি খামারে তাপমাত্রার হেরফের ঘটে। কখনো অনাবৃষ্টি আবার কখনো অতিবৃষ্টি। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় চিংড়ি চাষি শ্যামল কুমার বৈরাগী, প্রকাশ চন্দ্র মণ্ডল, আবু সাঈদ ও প্রভাষ চন্দ্র মণ্ডলকে।

বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা গ্রামের চিংড়ি চাষি রুহুল আমিন জানান, সারা মৌসুমই চিংড়ির দাম স্থীতিশীল ছিল না। এবারের মৌসুমে ২০/২২ সাইজের প্রতি কেজি চিংড়ির মূল্য ৯৫০ টাকা। গতবার এর চেয়ে দাম বেশি ছিল। সেপ্টেম্বর মাসে বৃষ্টির পর খামারের পরিবেশ এখন চিংড়ি চাষের উপযোগী হয়েছে। তবে, মৌসুমের শুরুতে রামপাল উপজেলার বাঁশতলি, পেড়িখালী, হুড়কা গ্রামের চিংড়ির খামারে ভাইরাস দেখা দেয়।

সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপ উপজেলার পাঠচালনা গ্রামের চিংড়ি চাষি আসলাম শেখ জানান, কাঙ্ক্ষিত নোনা পানি না পাওয়ায় চিংড়ি চাষে বিলম্ব হয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই দাকোপের তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষিরা কাঙ্ক্ষিত নোনা পানি পায়নি। তাছাড়া চিংড়ি পোনার মূল্য গতবারের থেকে এবার বেশি। কক্সবাজারের বিভিন্ন হ্যাচারির উত্পাদিত পোনা প্রকারভেদে প্রতি হাজার সাড়ে ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

স্থানীয় শিবসা ও পশুর নদীতে উত্পাদিত পোনা প্রতি হাজার ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় এবারে প্রতি হাজার পোনার মূল্য ২০০ টাকা করে বেশি।

বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার ফয়লা বাজারের ডিপো মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মল্লিক জানান, এখানকার আড়তের ১৫টি দোকানে গত মৌসুমে প্রতিদিন ৩০ মণ করে চিংড়ি আসত। এবারে আড়তে প্রতিদিন চিংড়ি আসার পরিমাণ গড়ে ২০ মণ। তিনি জানান, ৩০-৩৮ সাইজের প্রতি কেজি চিংড়ি ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত মৌসুমে এ সাইজের প্রতি কেজির মূল্য ছিল ৫৫০ টাকা। ১৬-১৮ সাইজের প্রতি কেজির মূল্য এবারে ৯৫০ টাকা। গত মৌসুমে এ সাইজের চিংড়ির মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা ছিল।

খুলনা জেলা মত্স্য কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, এ বছর অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে তাপমাত্রার তারতম্য ঘটায় দাকোপ, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় চিংড়ি খামারে রোগবালাই দেখা দেয়। বটিয়াঘাটা উপজেলার ৬৫টি আধা নিবিড় খামারের মধ্যে ৫টি খামারের বাগদা চিংড়ির উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে বাগদা চিংড়ির উত্পাদন আশানুরূপ হয়নি।