ইস্যু ও মেঘ

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:২২

  অয়েজুল হক

 

বিকালের দিকে হাঁটাহাঁটি করা ফরিদ সাহেবের একটা অভ্যাস। কাল শুক্রবারের ছুটি। অফিস থেকে বেরিয়ে ফুরফুরে মেজাজে আধাঘণ্টা কিংবা একঘণ্টা হাঁটবেন। নিচে নামতেই ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি। থামতে আধাঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেল। রাস্তায় হাঁটু সমান পানি জমা হয়েছে। ফরিদ সাহেব সেই পানিতে নেমে পড়লেন। কিছুদূর যেতেই দেখেন বিরাট জটলা। এত মানুষ কেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। কাছে গিয়ে জানতে পারলেন এটা একটা বিক্ষোভ। ডেঙ্গু রোগীর ভুল রির্পোট দেওয়ায় রোগীর স্বজনরাসহ সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত। ডায়গনস্টিক সেন্টারের লোকজনের সঙ্গে মারপিট হচ্ছে। ফরিদ সাহেব কেঁপে উঠলেন। দেশব্যাপী ডায়গনস্টিক সেন্টার আর ক্লিনিকের রমরমা ব্যবসা। এদের আবার চক্র আছে। এটাকে ইস্যু বানালে মুশকিল। মানুষের রাগ-ক্ষোভ দিনদিন বেড়ে চলেছে! কার ওপর রাগ, অনেক সময় সেটাই জানে না মানুষ! মানুষের ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য তাতে ফরিদ সাহেবের কিচ্ছু যায় আসে না। তিনি নিরেট সাদামাটা মানুষ। এই যে, পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর ফুঁসে উঠছে মানুষ। ড্রাইভারের শাস্তিসহ আরো কিছু দাবি আছে তাদের। সড়কে প্রাণ যায় না এমন দিন নেই। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় ড্রাইভার পালিয়ে যায়। ড্রাইভার নয়, এমন বহু আনাড়ি মানুষ ড্রাইভার হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। ব্যাপারটা একটা ইস্যু। দেশে একের পর এক ইস্যু তৈরি হচ্ছে। কোটা নিয়ে তোলপাড়। সোনা থেকে কয়লা। কয়লা থেকে পাথর। তারপর নিরাপদ সড়ক, আগুন, গুজব, হুজুগ। বালিশ, কম্বল, পর্দা! সবশেষে ডেঙ্গু। এইসব ইস্যুতে মানুষ আক্রান্ত, আতঙ্কিত। সরলতার সুযোগ নিয়ে চলছে প্রতারণা। সব মিলিয়ে দুদিন পরপর নতুন নতুন ইস্যু। এক ইস্যুতে চাপা পড়ছে আরেক ইস্যু। ইস্যু যদি মানুষ হতো, হাজার ইস্যুতে চাপাপড়া নিচের ইস্যুগুলোর দুরবস্থা, চিত্কারে আর নতুন ইস্যুরা আসত না। মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে, দরদি কণ্ঠে বলত, ‘নিচের চাপাপড়াগুলোকে আগে বাঁচা! ইস্যু আমার! ইস কি দুরবস্থা! মানুষ ইস্যু বানায় বলেই অসহায় ইস্যু শুধু চাপা পড়তে থাকে।’ হৈচৈ করে কিছু মানুষ ছুটে যায়। সামনে পুলিশের গাড়ি। সেদিকেই যাচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে পানি মাড়িয়ে ফরিদ সাহেব ছলাত্ ছলাত্ শব্দে দ্রুত স্থান ত্যাগ করাকেই শ্রেয় মনে করলেন। সেখান থেকে টানা দুই কিলোমিটার হাঁটাপথ। সারা রাস্তায় পানি। সারা রাস্তায় ক্ষুব্ধ মানুষ। কী হয়েছে কে জানে! ফরিদ সাহেবের জানতে ইচ্ছা করে না। সামনে আরেক জটলা। কারা যেন ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাধারণ একজনকে জখম করেছে। আহত বেশ কয়েকজন। জড়ো হওয়া মানুষ ক্ষুব্ধ। হঠাত্ নিকটস্থ গাড়িগুলো ভাঙচুর শুরু হলো। কে জানে এ গাড়িগুলোর কী অপরাধ! একটু বাদেই পুলিশের ধাওয়া। দৌড়ঝাঁপ। ডোবা রাস্তা পানির ঢেউ তোলে। পানিতে ডোবা রাজপথ উত্তপ্ত। পানি না থাকলে কী হতো কে জানে! আগুন ধরে যেত! রাস্তা ফুঁড়ে বেরোত অগ্নিশিখা! ফরিদ সাহেব উত্তপ্ত রাস্তায় দৌড় শুরু করলেন। রাস্তায় জমা পানি পা কামড়ে ধরছে। সামান্য পথ মাড়িয়ে হুড়মুড় করে পড়ে যান। পেছনে শোরগোল, চিত্কার। সামনে একটা পার্ক। আপাতত পার্কটাই নিরাপদ। যে পানি, তাতে বাকি পথটুকু সাঁতার কেটে চলে যাওয়া যাবে। হঠাত্ খুব কাছেই বাঁশির শব্দ। পুলিশ। ফরিদ সাহেব ডুব দেন। দম নেওয়ার তাগিদে হাত পাঁচেক সামনে গিয়ে ভুশ করে ভেসে ওঠেন। পেছন থেকে শোনা যায়, আরে এখানেই তো ছিল। গেল কই। ওরে বাবা, কী বেগতিক অবস্থা! সময়ক্ষেপণ না করে আবার ডুব। এবার সর্বশক্তি ব্যয় করে সোজা রাস্তা দিয়ে রকেটের গতিতে সামনে এগোলেন। চলার পথে একটু পরপর মাথা তুলে দম নেওয়া, পার্কের রাস্তাটা ঠিক আছে কিনা দেখা, আপতত এটাই কাজ। ডোবা রাস্তা মানুষের জীবনের জন্য কত উপকারী, এই প্রথম বুঝে আসে। ডুবে চলতে চলতে ফরিদ সাহেব ভাবেন, কতগুলো এডিস মশার লার্ভা খেয়েছেন কে জানে! পেটের মধ্যে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করে কিনা সেটাও অজানা! হঠাত্ শক্ত কিছুর সঙ্গে মাথায় ঘা, একই সঙ্গে ঘাড়ের ওপর বড় ধরনের চাপ!

‘আরে আরে এটা কী!’ চিত্কার করেই ফরিদ সাহেবের জামা ধরে পানির ভেতর থেকে টেনে তোলে। মানুষ! পায়ের নিচে পড়েছিল। হতবিহ্বল। পুলিশ! ফরিদ সহেব অবাক নন। কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, ‘বাবা আমি ইস্যু না, তবু ডুবেছি। ডুব দিয়ে পাড়া খেয়েছি।’

পেছন থেকে একজন খেঁকিয়ে ওঠে, ‘এখন আবার কিসের ইস্যু?’

—না স্যার, এখন সব ইস্যু ডেঙ্গু আতঙ্কে চাপা পড়েছে। সব ইস্যুর ঘাড়ে উঠে বসেছে ডেঙ্গু।

—ডুব দিয়ে কোথায় যাচ্ছিলি?

—পার্কে। ঐ যে দেখেন না, ওখানে তো ভাঙচুর নাই। ঐ দেখা যায়।

—পার্কে ডুব দিয়ে যাচ্ছ! এই বেটা রাস্তা কি ডুব দিয়ে যাওয়ার জায়গা। বুড়োধাড়ি!

অনেকক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন সামনের পুলিশ অফিসার। হঠাত্ করে ধমক দেন, ‘থামেন।’ ফরিদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার কিছু হয়নি তো চাচা?’

ফরিদ সাহেব অবাক হন। আসলে দুনিয়া ভালো-মন্দের জায়গা। সবখানে ভালো আছে, মন্দ আছে।

—না না, তেমন কিছু হয়নি।

ঠিকানা শুনে পুলিশ অফিসার একটা রিকশায় উঠিয়ে দেন। বাড়ি ফিরতেই শামীমের বড় ছেলেটা দৌড়ে আসে। ক্লাস টুতে পড়ে। রুদ্র।

—দাদু জানো?

—কী!

—স্কুল বন্ধ। কাল শুক্রবার খুব মজা হবে।

ফরিদ সাহেব রুদ্রের দিকে তাকান। কী মায়াবী নিষ্পাপ একটা মুখ! বিড়বিড় করে বললেন, ‘তোদের দিনগুলো সুন্দর হোক। আনন্দের হোক।’

আকাশে তখন কালো মেঘ।