বাতিঘরের আড্ডায় সমরেশ মজুমদার
ইত্তেফাক রিপোর্ট
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার বলেছেন, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের রাজধানী কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। গতকাল শনিবার বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সপ্তম তলায় বাতিঘরের আয়োজনে পাঠকের মুখোমুখি হয়ে এই বরেণ্য লেখক বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের রাজা-রানি চলে এসেছে ঢাকায়। বাংলা সাহিত্যের রাজধানী আগে কলকাতা ছিল, এটা আমি ৩০ বছর আগের কথা বলছি। কিন্তু গত ৩০ বছরে আমরা নতুন কোনো সুনীল শীর্ষেন্দু প্রফুল্ল রায়কে পাইনি। সেই আসা শুরু হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে। তিনি খুব বিনয়ের সঙ্গে জায়গাটি দখল করে নিলেন।
গতকাল বাতিঘর আয়োজন করে ‘বই প্রকাশের গল্প’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। এই আয়োজনে প্রকাশিত হয় সমরেশ মজুমদারের লেখা নতুন বই ‘অপরিচিত জীবনযাপন’ এবং বাদল সৈয়দের লেখা ‘জন্ম জয়’ বই দুটো। বাতিঘরের কর্ণধার দীপঙ্কর দাশের স্বাগত বক্তব্যের মঞ্চে আসেন সমরেশ মজুমদার।
লেখক হওয়ার উপায় জানতে চাইলে নতুন লেখকের জন্য সমরেশ মজুমদার উত্তরে বলেন, উপদেশ দিয়ে লেখক হওয়া যায় না। লেখক হতে হলে ভেতর থেকে তাড়না থাকতে হয়। একজন মা যখন সন্তানের জন্ম দেন তখন সেই সন্তানকে যেমন যত্ন না করলে তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় না, ঠিক তেমনি একজন লেখকের ভেতরে একটা উপলব্ধি তাড়িত না করলে তিনি লেখক হতে পারেন না।
তিনি আরো বলেন, নিজের কথা বলি, আমি কখনো একই জিনিস বারবার লিখিনি, লিখতে চাই না। এমনকি আমি একই ধরনের বাক্যও দুইবার লিখি না। ভুল করে লিখে ফেললেও তা বদলে ফেলি। এই গুণ প্রত্যেক লেখকের থাকতে হবে এবং নতুন কিছু দেওয়ার তাগিদ থাকতে হবে।
বরেণ্য এই সাহিত্যিক বলেন, ‘আমার লেখা ‘কালবেলা’ বইটা ন্যায্যভাবে এক লাখ সাত হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। আর বিভিন্ন পত্রিকা এবং নানা জায়গা থেকে জেনেছি, বাংলাদেশে আড়াই লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। কালবেলা উপন্যাসের মাধবীলতা তো বিয়ে না করেও সন্তানের মা হয়। এ ধরনের বই লিখলে তো অশ্লীলতার অভিযোগে সেটি বাতিল করে দেওয়ার কথা। কিন্তু বাঙালি পাঠক মাধবীলতাকে কেন গ্রহণ করলো? এর আগে আমি যখন ঢাকায় আসি তখন ঢাকা ক্লাবে একটি ছেলে আর মেয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তারা জানায়, তাদের নাম অনিমেষ এবং মাধবীলতা। আমি ভাবলাম, মজা করছে হয়তো। পরে তারা বলল, এফিডেবিট করেই তারা নিজেদের নাম রেখেছে অনিমেষ আর মাধবীলতা।’
সমরেশ মজুমদার বলেন, লেখালেখি অত্যন্ত যন্ত্রণার একটি বিষয়। এই যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায় যখন বাংলাদেশের কোনো বইয়ের দোকানে এসে দেখি ‘রাত তিনটে তোমাতে আমাতে’ বইয়ের নিচে লেখা সমরেশ মজুমদার। বইটি কেনার পর দেখি একটি অক্ষরও আমার নয়। কিন্তু বইয়ের পেছনে আমার ছবিটি দেয়া আছে। পাইরেসি চলুক সমস্যা নেই। কিন্তু যদি মূল বইটি ঠিক রেখে ছাপা হতো তাহলেও কষ্ট লাগত না।
এরপর দর্শকের কাছে সমরেশ জানতে চান, কেন অনিমেষ, মাধবীলতা চরিত্র এত জনপ্রিয় হলো? দর্শক সারি থেকে দুজন পাঠক সমরেশকে জানান, উপন্যাসটি কেন তাদের ভালো লেগেছে। এভাবেই আড্ডা গল্পে দীর্ঘ সময় কথা বলেন সমরেশ মজুমদার। অনুষ্ঠানে এই প্রখ্যাত সাহিত্যিক বলেন, যে কোনো কিছুতেই আলাদা হতে না পারলে, কেউ গ্রহণ করবে না। কেউ ফিরেও তাকাবে না। একই রকম লিখলে তো হবে না। ভিন্ন কিছু লেখার চেষ্টা করতে হবে।
অন্যদিকে শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই অনুষ্ঠানের মধ্যভাগে এসে হাজির হন লেখক বাদল সৈয়দ। তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল থেকেই এখানে এসেছি। অনুষ্ঠানটিতে সবার সঙ্গে উপস্থিত থাকব বলে।’
