বাদ পড়লেন শোভন-রাব্বানী

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:৪৬

রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে গিয়ে ৮৬ কোটি টাকার চাঁদা দাবি, মাদকে সম্পৃক্তসহ নানা বিতর্ক, সমালোচনা আর অভিযোগের মুখে মেয়াদপূর্তির ১১ মাস আগেই বাদ পড়লেন তারা। এদিকে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত                

সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রথম সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। গতকাল শনিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তাদের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী ও অভিভাবক হলেন শেখ হাসিনা। সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ভাঙব না। আগামী সম্মেলন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালন করবেন। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, শোভন-রাব্বানীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে। পদাধিকার বলে আল নাহিয়ান খান জয় ছাত্রলীগের ১ নম্বর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। আর লেখক ভট্টাচার্য এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থাকায় তিনিই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছেন। তারা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদেরকে দ্রুততম সময়ে ছাত্রলীগের সম্মেলন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান কাদের।

জানা গেছে, সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ইতিমধ্যেই ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সূত্র জানায়, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা ও সেবন, বিরোধী মতাদর্শীদের অর্থের বিনিময়ে অনুপ্রবেশ ঘটানো, স্বেচ্ছাচারিতা, ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন, দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ থেকে ৬ ভাগ চাঁদা দাবি, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অগ্রাহ্য করাসহ অসংখ্য অভিযোগ ছিল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানির বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রমাণও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বর্তমান কমিটি ভেঙে দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তা বাস্তবায়ন হলো। সূত্র জানায়, বৈঠকে শোভন-রাব্বানীর পক্ষে কেউ কোনো কথা বলেননি। কেন্দ্রীয় ৯ নেতার নেতৃত্বে গঠিত যে সিন্ডিকেটের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় তারা ছিলেন সেই সিন্ডিকেটের সদস্যরাও ছিলেন নিশ্চুপ। এখন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দিয়ে ছাত্রলীগের কার্যক্রম চালানো হবে। পরে সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব গঠন করা হবে।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আলী খানের ছেলে আল নাহিয়ান খান জয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাবার হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন তিনি। আল নাহিয়ান জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়েছেন। শোভনের সঙ্গে একই বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। এখন ক্রিমিনোলজি বিভাগ থেকে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স করছেন জয়। ছাত্রলীগের বিগত কেন্দ্রীয় কমিটির আইন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা জয় তার আগে সার্জেন্ট জহরুল হক হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্র। এখন স্নাতকোত্তর করছেন তিনি। যশোরের মনিরামপুরের ছেলে লেখক পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের ভাতিজা। লেখক ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও জগন্নাথ হল শাখার বিগত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

গত বছরের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন শেষ হয়। এরপর ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। শুরু থেকেই দুই নেতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দরজা সব সময় খোলা ছিল।

 শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ

গত ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় একের পর এক সংকট। কমিটিতে পদপ্রাপ্ত বিবাহিত, অছাত্র, রাজাকারের সন্তান, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের স্থান দেওয়াকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষ হয়। এসব ব্যক্তিকে বহিষ্কারের দাবিতে ক্যাম্পাস জুড়ে শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন। ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির ৯৯ জনকেই বিতর্কিত ব্যক্তি উল্লেখ করে একটি তালিকা গত ১৬ মে প্রকাশ করেন ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় গত ১৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের অন্তর্ভুক্ত করে ছাত্রলীগের কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেন; কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের চার মাস পার হলেও ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ ও বিতর্কের সমাধান হয়নি। উলটো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিয়ে ধোঁয়াশা ছড়ানো হয়। ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা ১৭ জন বিতর্কিত নেতার নাম প্রকাশ করে তাদের বহিষ্কারের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিয়েছিলেন; কিন্তু এই ঘোষণার প্রায় চার মাস পরও ফল পাননি নেতাকর্মীরা বরং তালিকাবিহীন ১৯টি পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়। কাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং কোন পদগুলো শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে, এ নিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন শোভন-রাব্বানী। এদিকে টেন্ডার-বাণিজ্যে বাধা দূর করতে সামান্য অজুহাতে ভেঙে দেওয়া হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি। বড়ো ধরনের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের টেন্ডার থেকেও কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগে এখন অস্থিরতা ক্যাম্পাসে।

ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরেকটি বড়ো অভিযোগ দুপুরের আগে ঘুম থেকে না ওঠা। তৃণমূলের নেতারা তাদের খুব একটা সাক্ষাত্ পান না। বিশেষ করে ছাত্রলীগ সভাপতিকে অনেক জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ফোন করেও পান না। ঢাকায় এলেও সাক্ষাত্ মেলে না। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্ধারিত সময় বেলা ১১টায় এলেও শোভন-রাব্বানী আসেন বিকাল ৩টায়। ততক্ষণ পর্যন্ত মন্ত্রী ক্যাম্পাসেই অবস্থান করছিলেন। প্রচণ্ড গরমে ভোর থেকেই নেতাকর্মীরা সম্মেলনস্থলে ছিলেন। এক পর্যায়ে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সুলতান মোহাম্মদ ওয়াসী নামে সংগঠনটির এক কর্মী। তখন সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে এ ঘটনার জন্য সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের গাফিলতিকেই দায়ী করা হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি আসার অনেক পরে আসেন তারা। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে প্রধান অতিথি করে আয়োজন করা ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে তাকে বসিয়ে রেখে দেরিতে আসার রেকর্ড আছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এই দুই নেতার। এসব বিষয় মোটেও ভালোভাবে নেননি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

এদিকে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগাতে অর্থ লেনদেন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছাত্রলীগের অফিস কক্ষে মাদক পাওয়ার বিষয়ে ক্ষুব্ধ হন প্রধানমন্ত্রী। গত ১৩ জুলাই কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর থেকেই কমিটি দিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির কথোপকথনের ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে তার সত্যতাও পাওয়া যায়। তবে অডিওর বিষয়টি অস্বীকার করে রাকিবুল ইসলাম দাবি করেন, ‘ঐ কণ্ঠ আমার নয়। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি।’ ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্প্রতি ফেনসিডিলের বেশ কয়েকটি খালি বোতল পাওয়া যায়। কার্যালয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিষয়টি অবহিত হন প্রধানমন্ত্রী।