শফিকুল ইসলাম খোকন
ওপরে নীল আকাশ, নিচে জলরাশি, মাঝখানে প্রকৃতি সাজিয়েছে অপরূপ রূপে একটি দ্বীপ, যার নাম ‘বিহঙ্গ দ্বীপ’। দ্বীপের একদিকে রয়েছে ধূ ধূ বালু চর, অন্যদিকে রয়েছে শীতল বালু। রয়েছে ঢেউয়ের গর্জন আর সুর্যাস্ত। পাখির কিচিরমিচির আর হরিণের বিচরণ তো আছেই। কাঁকড়া, শামুকের অবাধ ছোটাছুটি আর বিভিন্ন পাখির কলকাকলী মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দেয় যে কাউকে।
পাথরঘাটার কয়েকজন সংবাদকর্মী ও সমাজকর্মী দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই সৌন্দর্যে ভরা দ্বীপের সন্ধান পেয়েছেন। নাম রেখেছেন ‘বিহঙ্গ দ্বীপ’। নাম আর বাস্তবে যেন রয়েছে পুরো মিল। যেখানে বিহঙ্গের সঙ্গে বিহঙ্গের মিলন। বিহঙ্গরা উড়ে এসে জুড়ে বসে বিহঙ্গ দ্বীপে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সাগরের মাঝে বড় কোনো সবুজ পাহাড় । সাদা বালুচরের লাল কাঁকড়া, দূরে সাদা গাংচিল, বক, চেগা পাখি। বনের মাঝে পায়ে হাঁটা পথে কিছুদূর গেলে পাখির কলরব আর চোখের সামনে দিয়ে চলে যাবে মায়া হরিণের পাল।
সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদ। যে নদের পূর্বে রয়েছে পাথরঘাটা আর পশ্চিমে রয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। বলেশ্বর নদের মধ্যবর্তী জলরাশির মাঝেই জেগে ওঠে এ দ্বীপটি। পার্শবর্তী রুহিতা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের তথ্য মতে, এই দ্বীপটি জেগে ওঠে অন্তত ২০ থেকে ২৫ বছর আগে। আস্তে আস্তে প্রকৃতির নিজের সাজেই সজ্জিত হয়েছে দ্বীপটি। দ্বীপটিতে এক সময় স্থানীয় জেলেরা ধানসির চর বলেই জানতো। কারণ প্রথমে এ চরটি জেগে ওঠার সময় প্রচুর ধানসি ছিল। যা কালের পরিক্রমায় এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বলেশ্বর নদের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম গোলাকার প্রায় দেড়শ’ একর জায়গা নিয়ে জেগে উঠেছে এই চর। স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের অনেক আগেই এ চরে আনাগোনা ছিল। এ চরের সঙ্গে অনেক আগ থেকেই স্থানীয় সংবাদকর্মীরা পরিচিত ছিলেন। আগে থেকেই এ চরটির নামকরণসহ পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন সংবাদকর্মীরা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২৩ মার্চ প্রবীণ সাংবাদিক মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদ, পাথরঘাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, পর্যটনপ্রেমী আলোকচিত্রী সাংবাদিক আরিফুর রহমান, প্রত্যয়ের সভাপতি চিত্রশিল্পী মেহেদি শিকদার, সাংবাদিক এ এস এস জসিম, আবুজর ইবতে রাফি, ৭ম শ্রেণির শিক্ষাথী মো. বাইজিদ, জেলে মোস্তফা মুন্সী এই চরে গিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে বিহঙ্গ দ্বীপের সূচনা করেন। স্থাপন করেন ‘বিহঙ্গ দ্বীপ’ লেখা নাম ফলক। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, বনবিভাগ, স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্বীপটির চরপাশে বয়ে চলা নদীর স্রোত আর সমুদ্র সৈকত পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। পাথরঘাটা উপজেলার রুহিতা গ্রাম থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটে পৌঁছানো যাবে এ দ্বীপে। দ্বীপের পশ্চিমে রয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। দ্বীপে রয়েছে দীর্ঘ বালুতট, জোয়ারে গর্জন করে ফনা তুলে আঁছড়ে পড়ে সাগরের ঢেউ। আছে বন্য গাছ-গাছালি। সেখানে বাস করে শত রঙ ও প্রকারের দেশি ও বিদেশি পাখি। সামুদ্রিক কাঁকড়ার আলপনা অবাক ও বিমোহিত করবে পর্যটকদের। এছাড়াও দেখা যাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকারের দৃশ্য। শেষ গোধুলিতে যখন সূয সাগরের মাঝে ডুব দেয় তখন পশ্চিমের আকাশ সোনালি আবহ রেখে যায়। চরের পাশে জেলেরা জাল দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছ ধরেন। বিহঙ্গ দ্বীপের খুব কাছ থেকে দেখা যাবে সুন্দরবন।
মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদ ও আরিফুর রহমানসহ অনেকেই বলেন, এ দ্বীপ যে কাউকে মুগ্ধ করবে। প্রকৃতি যেন নিজহাতে অপরূপে সাজে সাজিয়ে রেখেছে। দ্বীপটির চারপাশ অথৈ জলরাশি ও সবুজে ঘেরা। এটি দেশের পর্যটন জোনের একটি অংশ হতে পারে।
পাথরঘাটা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান আকন বলেন, সম্প্রতি চরটি জেগে উঠেছে। নামকরণের পরদিনই আমরা চরটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে বনায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বনায়ন করতে পারলে এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হতে পারে। এছাড়া পাখিদের অভয়ারণ্যও হতে পারে। বিষয়টি আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।
পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবির বলেন, আমরা খুবই আনন্দিত বিহঙ্গ দ্বীপ নামটি শুনে। আমাদের উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যা যা করা দরকার তা করবো।
দ্বীপটিতে যেতে নদী বা সাগর ভ্রমণের সাধারণ লাইফ জ্যাকেট নিতে হবে। তাজা মাছ ভেজে খাওয়ার জন্য সঙ্গে নিতে পারেন ছোট গ্যাস সিলিন্ডার ও মাছ ভাজি করার আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র। বিহঙ্গ দ্বীপে থাকার মতো কোনো সুযোগ নেই। ঘুরে এসে পাথরঘাটা প্রাণকেন্দ্রে গেস্ট হাউস, রেস্ট হাউজ, বোর্ডিং ও ডাকবাংলোতে স্বল্প খরচে থাকা যাবে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে লঞ্চ ও গাড়িতে আসতে হবে পাথরঘাটায়। ঢাকা সদরঘাট থেকে বরগুনা লঞ্চে উঠে পাথরঘাটার কাকচিড়াঘাট নেমে গাড়িতে যেতে হবে পাথরঘাটা রূহিতা গ্রামে। রূহিতা বটতলা থেকে ট্রলার ও নৌকা ভাড়া করে বিহঙ্গ দ্বীপে যাওয়া যাবে।
