মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের ইঙ্গিত!

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১১

সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা

তালেব রানা

 

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। গত জুন ও জুলাইয়ে হরমুজ প্রণালির কাছে কয়েক দফা তেল ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলার ঘটনায় ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। একপর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতি শান্ত হতে না হতেই গত শনিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর মালিকানাধীন বড়ো দুটি তেল স্থাপনায় হামলা হয়েছে। সৌদি টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, আবাকাইক শহরে আরামকোর বৃহত্তম তেল শোধনাগার প্রকল্পে বিরাট আগুন জ্বলছে। এসময় খুরাইস তেলক্ষেত্রে দ্বিতীয় একটি ড্রোন হামলার পর সেখানেও অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে এই হামলার কারণে অপরিশোধিত তেল উত্পাদন দৈনিক ৫৭০ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে; যা দেশটির দৈনিক তেল উত্পাদনের অর্ধেকের সমান। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্দ্রে লিপো বলেছেন, এটা অনেক বড়ো ব্যাপার। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫ থেকে ১০ ডলার বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, ড্রোন হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তারা।

এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা। হুতিদের ঘোষণায় বলা হয়, সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি আরামকো পরিচালিত দুটি স্থাপনায় ১০টি পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোনের সাহায্যে এ হামলা চালানো হয়েছে। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ইরানসমর্থিত ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত একটি সামরিক জোট। ওই লড়াই শুরুর পর থেকে সৌদি আরবে বেশ কয়েকবার হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের আভা বিমানবন্দরে বেশ কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে এসব হামলায়। গত মাসে আক্রান্ত হয়েছিল সৌদির একটি প্রাকৃতিক গ্যাস উত্পাদন ক্ষেত্র। তাতে অবশ্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সামান্যই। তবে তেল স্থাপনায় শনিবারের ড্রোন হামলাকে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ধরনের হামলা বিশ্বে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হামলার জন্য যদি বিদ্রোহীরা দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত কয়েকশ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে হামলাকারী ড্রোনগুলোকে। কেউ কেউ সন্দেহ করছেন, হামলাগুলো ড্রোনের পরিবর্তে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হতে পারে। হুতি বিদ্রোহীরা এ হামলার দায় স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও শনিবার টুইট বার্তায় বলেছেন,

ইয়েমেন থেকেই যে ড্রোনগুলো এসেছিল, তার কোনো প্রমাণ নেই। হামলার পেছনে তেহরানের হাত আছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ কূটনৈতিক সম্পর্কে জড়িত থাকার ভান করা সত্ত্বেও সৌদি আরবে প্রায় ১০০ হামলার পেছনে তেহরান জড়িত। উত্তেজনা হ্রাসে সব আহ্বানের মধ্যেও ইরান এখন বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে অভূতপূর্ব আক্রমণ শুরু করেছে। তিনি বলেন, আমরা পৃথিবীর সব জাতিকে আহ্বান জানাই ইরানের এই হামলার প্রকাশ্য ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানাতে। তিনি আরো বলেছেন, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে কাজ করবে। হোয়াইট হাউজ বলছে, সৌদি আরব যাতে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, এজন্য তাদের সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে হামলার ঘটনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ফোনালাপে যুবরাজ বলেন, এ হামলার জবাব দিতে তার দেশ প্রস্তুত রয়েছে। হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা ও প্রস্তুতি দুটোই রিয়াদের রয়েছে। তার পরও নিরাপত্তা ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী সৌদি আরব।

মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব দীর্ঘ দিনের। এই অঞ্চলে শিয়াদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ার বিরোধিতা করে আসছে সৌদি। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিক শক্তি। এছাড়া কয়েকটি দেশে শিয়াসমর্থিত গোষ্ঠী রয়েছে ইরানের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে অন্যতম সেরা সুসজ্জিত সেনাবাহিনী রয়েছে সৌদি আরবেরও। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক। তবে সাম্প্রতিককালে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বৈরিতার পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান। তেল স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সহযোগিতা ও সমর্থন দিলে তা বড়ো সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।