যে কোনো সম্পর্কই একটি নিবেদন

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:২২

আপনাদের সকলের জীবনেই নানা সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে। তার মধ্যে প্রতিবেশী থাকে, বন্ধু থাকে, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা, ভাইবোন, প্রেমিক-প্রেমিকা, আবার এমন মানুষও থাকে, যারা হয়তো দুজনে দুজনকে সম্পূর্ণ ঘৃণাই করেন। এই সবই হলো একেকটি সম্পর্ক। এখন আপনাদের জীবনের সব রকম সম্পর্কই সৃষ্টি হয় মূলত আপনাদের একেকটি অভাব পূরণের তাগিদ থেকে—তা যেমন শারীরিক বা মানসিক হতে পারে, তেমনই আবার আবেগপ্রবণতা, সামাজিকতা বা অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতাও হতে পারে। আসলে আপনার মধ্যে ঠিক যে ব্যাপারটির অভাব, তা পূরণের জন্যই আপনি নির্দিষ্ট একটি সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাই সেই অভাবটি যদি পুরোপুরি না মেটে, তবে সেই সম্পর্কটিও টিকতে পারে না।       

আমাদের জীবন আজকাল হয়ে দাঁড়িয়েছে খুবই জটিল। আমরা তাই প্রতিনিয়তই এক ধরনের সম্পর্ক ছেড়ে আরেক ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছি। এক মুহূর্ত আগেই আপনি হয়তো আপনার ব্যবসায়ের অংশীদারের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন, আবার পরের মুহূর্তেই আপনি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন। জীবন ঠিক এমনই। প্রতি মুহূর্তেই একটি সম্পর্ক ছেড়ে আরেকটি সম্পর্কে জড়ানো। তাই আপনার ব্যবসায়ের অংশীদারের সঙ্গে যেমন হাবভাব করেন, তেমনটাই যদি আপনার স্ত্রীর সঙ্গেও করেন, আপনাকে তবে বিরাট ঝামেলা পোহাতে হবে। আবার উলটোদিকে স্ত্রীর সঙ্গে আপনার যেমন আচরণ, সেটাই যদি অংশীদারটির সঙ্গেও করেন, তাহলেও ঝামেলা কম হবে না। ফলে দুহাতে বল লোফালুফি করা জাদুকরদের মতোই প্রতিটি সম্পর্ককে সামলে চলতে হয়। তবে কিনা আপনাকেই বুঝতে হবে, কটা বল আপনি লুফতে পারবেন। একটা বল হলে তো খুবই সোজা। কিন্তু আপনি যদি দশটা বল হাতে নেন, তখন লোফালুফিটা খুবই কঠিন হয়ে যায়। কেননা আপনি তো একটা বলকেও ফেলতে চাইবেন না, পাছে ঐ একটা বল পড়লেও আপনার জীবনের একটা অংশ খসে পড়ে।

সুতরাং একই সঙ্গে দশ-দশটা বলকেই আপনি একনাগাড়ে লুফে চলতে চান। আর যখন ওভাবে দশটা বল নিয়েই আপনার লোফালুফি চলে, আপনি কি অন্য কিছু আর ভাবতে পারেন?

স্রেফ উপলব্ধির জোরে টিকে থাকার অন্য একটা উপায় অবশ্য আছে, যাতে কোনো রকম সম্পর্ক ছাড়াই কেউ জীবন কাটাতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজের মধ্যে এত বেশি পূর্ণতা খুঁজে নিতে হবে যে তখন কিছুতেই কিছু এসে যাবে না। কিন্তু এখন বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই তাদের সম্পর্কের মানই জীবনের মানকে নির্দিষ্ট করে দেয়। তাই এখন একবার দেখা যাক, যে যেখানেই থাকি না কেন, কীভাবে প্রতি মুহূর্তেই আমরা একটি সুন্দরতম সম্পর্ক গড়ে নিতে পারি।

আপনাদের যদি এ নিয়ে ভাবতে বলি, আপনারা নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়ার কথা আর সেই সঙ্গেই নতুন নতুন কিছু কাজকর্মের কথাই ভাববেন। আপনারা নতুন বন্ধু বানান, বিয়ে করেন, আপনাদের বাচ্চা হয়, নতুন ব্যবসায় শুরু করেন—আপনারা সবকিছুই করেন—কেননা মনের কোথাও না কোথাও আপনাদের একটা বিশ্বাস থাকে যে, ওগুলোই আপনাদের সুখী করবে। সুখের সন্ধানে তাই অমন সব সম্পর্কই আপনারা গড়ে তোলেন। কিংবা অন্যভাবে বললে, মানুষজনের  মধ্যে থেকে আপনারা সুখের রস বার করে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান। আর একবার তেমনটা করে বসলেই সম্পর্কগুলো তখন বরাবরের মতো সমস্যার পাহাড় হয়ে যায়। তখন সম্পর্ক বাদ দিয়ে আপনি থাকতে পারেন না, সম্পর্ক নিয়েও পারেন না।

সম্পর্ককে যদি সত্যিকারের সুন্দর করে তুলতে হয়, তবে সবচেয়ে জরুরি হলো—মানুষকে অন্তর্মুখী হতে হবে, আর অন্য কাউকে দেখার আগেই তাকে এক গভীর দৃষ্টি দিতে হবে নিজের মনের দিকে। যদি আপনি নিজেই কোনো আনন্দের উত্স হতে পারেন, আর আপনার সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষেরাও যদি আপনার সেই আনন্দের ভাগ নিতে চান—যা সেই সম্পর্ক থেকে আদায় করে নেওয়া সুখ নয়—একমাত্র তখনই আপনি যে কোনো মানুষের সঙ্গেই এক অসাধারণ সম্পর্ক গড়তে পারেন।

আপনি যদি নিজের আনন্দ কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান, তাহলে কি পৃথিবীতে কারো সঙ্গেই আপনার সম্পর্কের সমস্যা হতে পারে? না। আসলে আপনারা সবার থেকেই সুখ নিংড়ে নিতে চান, আর ওখানেই হলো আপনাদের সমস্যাটা। নানা ধরনের সম্পর্ক যে একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার কারণই হলো, সেই সম্পর্কের জোরে আমরা জীবনকে উন্নত করতে চাই না। চাই বড়োজোর জীবনের কিছু ফাঁকফোকর ঢাকতে।    

আপনার সম্পর্ক যদি কারো থেকে কিছু নিংড়ে নেওয়ার মতো হয়, সেক্ষেত্রে আপনি কতটা কী সামাল দিতে পারলেন, তাতে কিসসু যায়-আসে না। আপনার সমস্যা বাড়তেই থাকবে। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে আপনার পাশটিতেই যিনি বসে আছেন, তার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটি যদি এক নিবেদন হয়ে উঠত, তবে সবকিছু সুন্দর হতে বাধ্য।  

n সৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন