ইউছুফ হারুনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত শুরু

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:৫৫

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াক্ফ) বাংলাদেশ-এর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. হাকিম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার ভূমিকা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রশ্ন ওঠার পর এবার অভিযোগ গেছে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। গত ২৮ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা পড়ার পর ইউছুফ হারুনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সরেজমিন অনুসন্ধান শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক এম সানাউল হক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রায়পুরের গণহত্যার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তদন্ত সংস্থার সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।

ট্রাইব্যুনালে দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। সেখানে সংঘটিত হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের ঘটনায় ইউছুফ হারুনের সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, রায়পুরে চার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সহযোগী, সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বেশ কয়েকজনের শাস্তি কার্যকর এবং অনেকের বিচারকাজ চললেও বহাল তবিয়তে ওয়াকফ্ প্রতিষ্ঠান হামদর্দের এমডি পদে ৩৩ বছর ধরে আসীন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রায়পুর এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে অসম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করা মো. ইসমাইল দাবি করেছেন, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা ছিলেন ইউছুফ হারুন। তখন রায়পুরে ২৫০ সদস্যের সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছিল, যারা পুরো এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। রাজাকার কমান্ডার নজরুল ও সিরাজ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে রায়পুরে গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং ইউছুফ হারুনের বিচার দেখে যাওয়ার আকুতি জানান ইসমাইল। ঐ এলাকার আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্যরাও একই দাবি তুলেছেন।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য সম্প্রতি ইউছুফ হারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তাকে ফোন করা হলেও এমনকি প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে মোবাইলে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের শেষ দিকে রায়পুর থেকে পালিয়ে যান ইউছুফ হারুন। একাত্তরের নভেম্বর থেকে বাহাত্তরের মার্চ পর্যন্ত পাঁচ মাস আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। এরপর প্রকাশ্যে আসেন। জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর জেলার উত্তর জয়পুরে চৌপল্লী বাজার এলাকার দত্তপাড়ার দক্ষিণ মাগুরী গ্রামের আবু সাঈদ উল্লাহ ভূঁইয়ার ছেলে ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া। তিনি পড়াশোনা করেছেন লক্ষ্মীপুর সদরের টুমচর কামিল মাদ্রাসা ও রায়পুর থানার রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসায়। মাদ্রাসার নথি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে কামিল পাশ করেন ইউছুফ হারুন। ঐ মাদ্রাসায় তার রোল নম্বর ছিল ১৩১৯। আর পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ইউছুফ হারুনের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ মার্চ।

জানা গেছে, ১৯৭২ সালের জুনে ১৭০ টাকা বেতনে হামদর্দের গুলিস্তান শাখায় কাউন্টার সেলসম্যান হিসেবে যোগ দেন ইউছুফ হারুন। মাত্র দেড় দশকের মাথায় ১৯৮৬ সালে হামদর্দের এমডি হয়ে যান। এরপর ওয়াকফ্ আইনের  তোয়াক্কা না করে হামদর্দে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইতিমধ্যে হামদর্দের গেজেট পালটে নিজে আমৃত্যু ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার বন্দোবস্ত করেছেন। এমনকি নিজের অবর্তমানে পরিবারের সদস্যরা হামদর্দের কে কোন পদে থাকবেন, তাও গেজেটে লিখিয়ে নিয়েছেন, যা নিয়ে গত ২৩ এপ্রিল তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এছাড়া ইউছুফ হারুনের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২৯ আগস্ট দুদক তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে।

ইউছুফ হারুনের সঙ্গে জামায়াতের সখ্য থাকার বিভিন্ন সচিত্র তথ্যও জমা পড়েছে ট্রাইব্যুনালে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলা জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলী একসময় হামমর্দের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের সঙ্গেও ইউছুফ হারুনের অন্তরঙ্গতার একাধিক ছবি রয়েছে।