ড. মিল্টন বিশ্বাস
বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘ আজ অপরিহার্য—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই—জাতিসংঘকে আরো শক্তিশালী ও জোরদার করার জন্য সব সদস্যভুক্ত দেশের প্রতি এভাবেই একদা আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের জন্য ২২ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে পৌঁছাবেন। অধিবেশনে যথারীতি বাংলায় ভাষণ দেবেন ২৭ সেপ্টেম্বর; ২৮ সেপ্টেম্বর তার ৭৩তম জন্মদিন। ২০০৯ সাল থেকে একটানা ভাষণের এটি হলো ১১তম ভাষণ; সর্বমোট ক্ষমতার ১৬ বছরে ১৪তম ভাষণ। কারণ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত শাসনকালে তিনি তিনবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া শেখ হাসিনার ১৩টি ভাষণ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, বিশ্বসভায় তিনি নতুন পৃথিবী বিনির্মাণে বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকা পালনের দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন প্রথম থেকেই। বিশ্ববাসীকে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই। বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘের গৃহীত যে কোনো আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ড এদেশের ওপর ন্যস্ত করা হলে সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম আমরা। লক্ষ করা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে অসাধারণ কথা উচ্চারণ করেছেন একটানা কয়েক বছর। তিনি বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, বিশ্বব্যাপী সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষুধা ও পরমাণু অস্ত্রের শঙ্কামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য আরো বলিষ্ঠ, কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন বারবার। শেখ হাসিনার আহ্বান সব সময়ই ছিল বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। একবিংশ শতাব্দীর বাসিন্দারা চায় যুদ্ধ ও সমরসজ্জার উন্মত্ততামুক্ত, পরমাণু অস্ত্রের শঙ্কামুক্ত এক শান্তিময় বিশ্ব; চায় রাজনৈতিক দিক থেকে স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ পৃথিবী। বিশ্ববাসীর এই প্রত্যাশা পূরণের শেষ ভরসাস্থল হচ্ছে জাতিসংঘ। কারণ, একমাত্র জাতিসংঘই হচ্ছে এমন একটি বিশ্বসংস্থা, যা বিশ্বব্যাপী স্থায়ী ও ব্যাপকভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতার কাঠামো নির্ধারণ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত করার জন্য পৃথিবীর মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও কর্মোদ্যগের প্রতিনিধিত্ব করে। আর সে কারণেই জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এসেছে। এই শতাব্দীতে এসে বিশ্ববাসী জাতিসংঘের কাছে আরো সক্রিয় ও বলিষ্ঠতর ভূমিকা প্রত্যাশা করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান রাখার জন্য জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো শেখ হাসিনাকে ১৯৯৮ সালের ‘ফেলিক্স হুফে বইনি’ শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেছে। ১৯৯৯ সালে ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (FAO) কর্তৃক ‘সেরেস পদক’ লাভ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। শিশুমৃত্যু হ্রাস-সংক্রান্ত এমডিজি-৪ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ কর্তৃক এমডিজি অ্যাওয়ার্ড-২০১০ পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১২ সালে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বিশেষ অবদানের জন্য ইউনেস্কো কর্তৃক ‘কালচারাল ডাইভারসিটি পদক’ লাভ করেন শেখ হাসিনা। ১৭ ডিসেম্বর সাধারণ অধিবেশনের সভায় ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সমর্থনে জাতিসংঘে তার দেওয়া ‘জনগণের মতায়ন’ ও ‘শান্তির সংস্কৃতি’ প্রস্তাব পাশ হয়। ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দেশে খাদ্যের নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ-সাউথ কো-অপারেশনের ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড-২০১৩’ পুরস্কার লাভ করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নারী ও কন্যাশিশুদের স্বাক্ষরতা ও শিক্ষার প্রসারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘শান্তির বৃক্ষ’ (ট্রি অব পিস) স্মারক উপহার প্রদান করে ইউনেস্কো। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ২৯তম বিশেষ অধিবেশনের ক্রেডেনশিয়াল কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে গ্লোবাল নিউজ এজেন্সি ইন্টার প্রেস সার্ভিস (আইপিএস) রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য তাকে সংগঠনটির পক্ষ থেকে তার অত্যন্ত মর্যাদাশীল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। তাছাড়া গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন তাকে ‘২০১৮ স্পেশাল রিকগনিশন ফর আউটস্ট্যান্ডিং লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব (২০০৭-২০১৫) বান কি মুন বলেছেন, শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে, সামরিক শাসন ও জঙ্গিবাদ উত্খাত এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবল করার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক কার্যক্রম (ইউএনএইচসিআর) ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে নেওয়া পদপেগুলোর প্রশংসা এবং বর্তমান মহাসচিব বাংলাদেশে আশ্রিত শরণার্থীদের অবস্থা দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
