গত ছয় মাস ধরে আমার পড়ার টেবিলে নিত্যসঙ্গী ফারুক হোসেনের ৮০০ ছড়া। প্রকাশক মনিরুল হক। ফেব্রুয়ারিতে মনির ভাইকে বলেছিলাম, ৮০০ কেন ওস্তাদ?
মনির ভাই ততোধিক উচ্চ স্বরে হেসে বললেন, হাজার ছড়া তো আমীরুলের বাইর কইরা দিছি। আবার হাজার ছড়া কেন বাইর করুম। অহন ৮০০ বা ৭০০ বা ৫০০ বাইর অইব।
আর ফারুক হোসেন বলল, আমীরুলকে তো আর ধরা যাবে না। তাই ৮০০ নিয়াই সন্তুষ্ট আছি।
আমি মিটিমিটি হাসলাম। সংখ্যা দিয়ে গুণবিচার করা যায় না। আমি নিজে কত না খাপছাড়া, এলোমেলো ছড়া লিখেছি। হিসাব নাই আমার ছড়ার।
কিন্তু ফারুক হোসেন উত্কৃষ্টমানের পদ্য, ছড়া বা চটুল ছড়া লিখেছেন। তার ছড়ার বিষয় মূর্ত হয়ে ওঠে। সমকালীন প্রসঙ্গ আলোকিত হয়। দেশীয় বা আন্তর্জাতিক ঘটনাসমূহ ছন্দে ছন্দে নেচে ওঠে।
ফারুক অনেক শক্তিমান লেখক। তার ছড়ায় অনেক অনাস্বাদিত মিল, বাক্যরীতি বিষয়াদি এমন বিমূর্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে আমাদের বিস্ময়ের শেষ থাকে না।
শত শত পঙিক্ত উদাহরণ দেওয়া যায়। বরং বইটা উলটেপালটে দেখে নেওয়াই ভালো। ফারুকের ছড়ার বইয়ের নামগুলো আলাদা ধরনের হলেও একই প্যাটার্নের। এই নামের মধ্যেই তার স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়।
আমি ফারুক হোসেনের আকাশের মতো বিশাল ছড়ার নীলাভ রং থেকে সামান্য দু-চারটি কথা বলার সাহস করতে চাই। ফারুক নানা টাইপের ছড়া লিখেছেন। কোনো ছড়া তার খাঁটি দেশজ ছড়া। কোনোটা পদ্যগন্ধি, কোনোটা কাব্যগন্ধি—তবে সব ছড়াই অবশ্য নদীর একই মোহনায় গিয়ে মিশেছে।
২.
ফারুক হোসেনের ছড়ার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য প্রকট। প্রথমত ছোটদের জন্য হাস্যরস ধারার ছড়া। তিনি কৌতুকাশ্রয়ী গল্পকে ছড়ার ছন্দে লিপিবদ্ধ করেন। যারা ছড়াকে ছড়ার লৌকিক মাধুর্যে উপলব্ধি করতে চান তারা ফারুকের অনেক ছড়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেন।
আমি সেই কুতর্কে যাচ্ছি না। ছড়াকে আমি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে কবিতারই অংশ বলে মনে করি।
ফারুকের আরেক ধারার ছড়ায় সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ কৌতুকের আবরণে বেষ্টিত থাকে। ফারুক হোসেনের কিছু ছড়ায় শিশুর জগত্ মূর্ত হয়ে ওঠে। ঘুড়ি, লাটিম, ছেলেবেলা, নদী, পাখি, প্রজাপতি বারবার ঘুরে ফিরে আসে।
কবজির জোর আছে বলেই ফারুক হোসেন দ্যুতিময় ছড়া লিখে থাকেন অতি স্বাচ্ছন্দ্যে। তিনি বহুপ্রজ ছড়ালেখক। পাঠকের কাছাকাছি ছড়াকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি নিরন্তর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। তার লেখা ‘জাতিসংঘ’ ছড়াটি ১৯৮৪ থেকে পাঠকপ্রিয়তার তালিকায় আছে।
ফারুকের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য—ছড়ায় তিনি দেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধকে বারংবার রূপায়িত করেছেন ছন্দে-বর্ণে। উদাহরণ কণ্টকিত করে এই লেখায় ফারুককে আমি প্রমাণের চেষ্টা করব না। ‘৮০০ ছড়া’ বইটা পড়লে সাধারণ সাহিত্যজীবী পাঠকও ফারুকের ছড়ার বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করতে পারবেন।
আমি ফারুকের একজন গুণমুগ্ধ পাঠক। মনোযোগ দিয়ে তার ছড়া পড়ে আসছি ৩২ বছরের অধিককাল ধরে। ফারুক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। অতি ব্যস্ততায় তার দিন কাটে। তারপরও ফারুক তার হূদয়তার জন্য শিশুসাহিত্যে নিমগ্ন থেকেছেন। কর্মসূত্রে বিদেশ গিয়েছেন। কিন্তু প্রবাসজীবনেও ভ্রমণকাহিনির আদলে বই লিখেছেন। সেই বইও ছোটদের জন্য।
৩.
ফারুকের ‘৮০০ ছড়া’ বইটা দেখে কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠি। সেই ১৯৯৬ সালে ‘এক হাজার ছড়া’ প্রকাশিত হয়েছিল আমার। একই প্রকাশনী ‘অনন্যা’ থেকে। ৮০০ ছড়া যখন ছাপা চলছে তখন একদিন আমি বাংলাবাজারে। অনন্যার স্বত্বাধিকারী মনিরুল হকের টেবিলের সামনে।
মনির ভাই প্রচ্ছদটা দেখালেন। আমি আগ্রহী হয়ে উঠলাম। মনির ভাইকে বললাম, আরে মিয়া, একটা ভালো কাজ করলেন দেখি।
মনির ভাই হাসলেন। বললেন, বই তো সবই ছাপতে মন চায়। বই ছাপা তো একটা নেশা। ৮০০ ছড়া ছাইপা মজা পাইতাছি।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, মিয়া, আমারে তো ধ্বংস কইরা দিলেন। ‘এক হাজার ছড়া’ তো মার্কেটে নাই। ছাপবেন না? ৮০০ ছড়ার ধাক্কায় আমি তো হাওয়া মনির ভাই।
মনির ভাই জোরে হাসতে থাকেন, আরে আমীরুল, সংসারে যে যার ভূমিকায়।
কথাটা মেনে নিলাম। ফারুক আমার চেয়েও বেশি ছড়া একদিন লিখে ফেলবেন। শুধু সংখ্যা নয়, গুণগত বিচারেও ফারুকের ছড়া সমৃদ্ধ। ফারুক অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলেছেন।
৪.
ফারুক হোসেনের সমগ্র শিশুসাহিত্যের দিকে তাকালে আচ্ছন্ন হয়ে যাই। কিছু লিখব বা কিছু মন্তব্য করব সে সাহস আর হয় না। বিস্ময়ে তার রচনাসম্ভারের দিকে তাকিয়ে থাকি। বন্ধু ফারুক হোসেন—তোমার কীর্তির দিকে তাকাইয়া স্তম্ভিত হইয়া থাকি।
