আহসান জোবায়ের
‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগতটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে’—এভাবেই পৃথিবীকে ঘুরে দেখার বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সব মানুষেরই ইচ্ছে থাকে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা আশ্চর্য স্থাপনাগুলো দেখার। ব্রিটিশ পরিব্রাজক সায়মন উইলসনেরও ইচ্ছে হলো পৃথিবীর সাত আশ্চর্য স্থান তিনি ঘুরে দেখবেন। একটি ছোট্ট ব্যাগে দুটি টি-শার্ট, একটি ট্র্যাকস্যুট আর একটি ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
ইতালির রোমের কলোসিয়াম, মিসরের গিজার গ্রেট পিরামিড, জর্ডানের বিলুপ্ত নগরী পেত্রা, ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার মূর্তি, মেক্সিকোর মায়া সভ্যতার বিস্ময় নগরী চিচেন ইত্জা, চীনের গ্রেট ওয়াল ও ভারতের তাজমহল ঘুরে দেখেছেন তিনি। ৬ দিন ৯ ঘণ্টা ৩ মিনিটে ৩০ হাজার ৩শ’ মাইলের এই যাত্রায় স্ন্যাক্স ও বিমানের ফ্লাইটের খাবার খেয়ে কাটিয়েছেন। ঘুমিয়েছেন মাত্র ২ দিন। পাঁচ মহাদেশের সাতটি আশ্চর্য উপভোগ করতে বাংলাদেশি মুদ্রায় খরচ হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা। সায়মন ঘোরাঘুরির পাশাপাশি ইউটিউবে ভিডিও বানাতে ভালোবাসেন। তাই সাতদিনের পুরো ভিডিও তিনি নিজ ক্যামেরায় ধারণ করেন।
রোমান কলোসিয়াম
সায়মনের মহাকাব্যিক এই যাত্রার শুরু হয় ম্যানচেস্টার বিমানবন্দর থেকে রোমের উদ্দেশ্যে। ২৮ জুলাই ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে রোমের উদ্দেশ্যে ফ্লাইট ধরেন। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার থেকে কলোসিয়াম এর দূরত্ব ১ হাজার ৩০০ মাইল। গ্ল্যাডিয়েটরদের স্মৃতিবিজড়িত কলোসিয়াম দু-ঘণ্টা ঘুরে দেখেন তিনি। কলোসিয়াম প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন, যা একইসঙ্গে রোমানদের হিংস্রতা আর নির্মাণশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হয়ে টিকে আছে শতশত বছর ধরে। ইউনেস্কো কলোসিয়ামকে ১৯৯০ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের স্বীকৃতি দেয়। এটি পৃথিবীতে মনুষ্যসৃষ্ট আধুনিক সপ্তাশ্চর্যের একটি বলে নির্বাচিত হয় ২০০৭ সালে। রক্তপিপাসু রোম সম্রাটদের বিকৃত আনন্দের খোরাক জোগাতে গিয়ে কত মানুষ যে প্রাণ হারিয়েছে এই কলোসিয়ামে, তার সঠিক হিসেব ইতিহাসে পাওয়া যায় না। শুধু মানুষই তো নয়, কলোসিয়ামের মাটিতে মিশে আছে অসংখ্য বন্যপ্রাণীর রক্ত। ধারণা করা হয়, কলোসিয়ামের মাটিতে শতশত বছর ধরে চলা লড়াইয়ের প্রদর্শনীতে প্রাণ হারিয়েছে ৫ লক্ষাধিক গ্লাডিয়েটরস এবং ১০ লক্ষেরও বেশি বন্যপ্রাণী। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে আঠার শতক পর্যন্ত কলোসিয়াম ছিল প্রায় অবহেলিত ও পরিত্যক্ত। যদিও এর মাঝে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু সেসময় এটি রক্ষণাবেক্ষণের তেমন কোনো প্রচেষ্টা ছিল না বললেই চলে। বহু বছরের অবহেলায় কলোসিয়ামের মূল স্থাপত্যের দুই-তৃতীয়াংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবু আজো এই কলোসিয়াম পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় একটি ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে খ্যাত। ইতালির সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট এটি। কলোসিয়াম দেখার জন্য প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায় ইতালিতে।
গিজার পিরামিড
এরপর তিনি রওনা হন ১ হাজার ৪৬৮ মাইল দূরে গিজার পিরামিডের উদ্দেশ্যে। ছোটবেলায় যখন পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্য সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হতো তখন মিশরের পিরামিডই প্রথমে মনে ভেসে উঠতো। পিরামিডের দেশ মিশরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ১৩৮টির মতো পিরামিড আছে। এর বেশিরভাগই দেশের রাজা ফারাওদের এবং গণ্যমান্য ব্যক্তির কবরস্থান। ফারাওগন আশা করতেন মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে তারা দেবতুল্য বা দেবতা হয়ে যাবেন। তাই মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির অঙ্গ হিসেবে তারা দেবতাদের জন্য মন্দির ও নিজেদের জন্যে পিরামিড তৈরি করাতেন। এই পিরামিডগুলোতে মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখতেন। সায়মন উইলসন এই জায়গাগুলো কয়েক ঘণ্টা ঘুরে দেখেন।
পেত্রা
৪৭০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে জর্ডানের পেত্রায় প্রত্মতাত্ত্বিক বিস্ময় দেখে মুগ্ধ হন সায়মন। ধারণা করা হয়, এটি প্রায় ২ হাজার বছর পুরোনো। তখন আরবে অনেক জাতি ছিল, তার মধ্যে একটি হলো নাবাতিয়ান। এই নাবাতিয়ান জাতির রাজধানী ছিল পেত্রা শহর। এখান দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক রাস্তা গিয়েছিল। শহরটি মূলত সেই বাণিজ্য পথকে কেন্দ্র করেই বানানো হয়েছিল। পথের যাত্রীদের নির্ভর করে শহরটি হয়ে উঠেছিল রমরমা। পেত্রা নগরী ছিল সুরক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। পেত্রা নগরী মূলত একটি সুরক্ষিত দুর্গ ছিল। এটি বিখ্যাত সাধারণত এর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর জন্য। শহরটি তৈরি করা হয়েছিল পাথর কেটে। অনেক গুহা আছে এই নগরীর আনাচে-কানাচে। আসলে এই গুহাগুলোই চলাচল করার রাস্তা। গুহার পাশেই রয়েছে কঠিন পাথরের দেয়ালের গায়ে গ্রথিত সেই প্রাচীন দালানগুলো। যার মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত হলো ‘খাজনেত ফিরাউন’ নামক মন্দিরটি। হলিউডের ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স অ্যান্ড দ্য লাস্ট ক্রুসেড’ (১৯৮৯) ছবির শুটিং হয়েছে সেখানে। এদিন জর্ডানে ৪১ পাউন্ডের বিনিময়ে একটি গুহায় রাত কাটান সায়মন।
তাজমহল
দুটি ফ্লাইট ও ৪ ঘণ্টা ক্যাবে ২ হাজার ৫০০ মাইল অতিক্রম করে সায়মন যান তাজমহলে। মোগল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই অপূর্ব সৌধটি নির্মাণ করেন। সৌধটি নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে, যা শেষ হয় ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে। সৌধটির নকশা কে করেছিলেন এ নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও এটি পরিষ্কার যে, শিল্প-নৈপুণ্যসম্পন্ন একদল নকশাকারক ও কারিগর সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন। যারা ওস্তাদ আহমেদ লাহুরীর সঙ্গে ছিলেন। এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল। ভ্রমণের দিন সেখানকার তাপমাত্রা ছিল ৪২ সেন্টিগ্রেড, যা তাকে বেশ ভুগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে অনেক উষ্ণ দেশে বেড়িয়েছি। কিন্তু এমন দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো গরম কোথাও লাগেনি। ঘেমে ভিজে গিয়েছিলাম।’
গ্রেট ওয়াল
তাজমহলে কালক্ষেপণ না করে তিনি রওনা দেন চীনের গ্রেট ওয়ালের উদ্দেশ্যে। দিল্লি থেকে একটি ফ্লাইট ও ১২৫ পাউন্ডের রিটার্ন ক্যাব রাইডে চড়ে চীনের গ্রেট ওয়ালে পৌঁছান তিনি। যার দূরত্ব ২ হাজার ২৭০ মাইল। চীনের ঐতিহাসিক উত্তরাঞ্চলের বর্ডারে চায়না রাজ্য এবং রাজত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে এই প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি বর্ডারের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকের রেখা বরাবর নির্মিত। ইউরেশিয়ান প্রান্ত থেকে যাযাবর গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ ঠেকাতেই তখন এ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল। চীনের প্রাচীর আসলে বেশকিছু দুর্গের সমষ্টি। চীনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, একে প্রায়শই ঐতিহাসিকরা ১০ হাজার মাইল দীর্ঘ দেয়াল বলে অভিহিত করতেন। ঐতিহাসিক সিমা কিয়ানের বর্ণনাতেও এমনটাই দেখা যায়। যদিও এ ১০ হাজার সংখ্যাটি এর প্রকৃত দৈর্ঘ্য না বুঝিয়ে অনেক দীর্ঘ এই বিষয়টির দিকেই ইঙ্গিত করেই ব্যবহার করা হতো। মঙ্গোলিয়ার দস্যুদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতক থেকে শুরু হয়ে আড়াই হাজার বছর ধরে চলে পৃথিবীর দীর্ঘতম এই প্রাচীর নির্মাণ কাজ, যা আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
চিচেন ইত্জা
চীন থেকে সায়মন ৯ হাজার ৩৪০ মাইল পাড়ি দিয়ে থামেন মেক্সিকোর চিচেন ইত্জায়। এটি ৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মায়া সভ্যতার উত্তরাংশে অবস্থিত নিম্নভূমির একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। চিচেন ইত্জা প্রাক-কলম্বিয়ান সময়ে নির্মিত প্রাচীন একটি শহরের নাম। শহরটি মায়া সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর বর্তমান অবস্থান মেক্সিকোর ইউকাতান রাজ্যের তিনুমে। চিচেন ইত্জা বিভিন্ন সময় মায়ানদের নিম্নভূমির প্রধান একটি কেন্দ্র ছিল। এটি মায়ানদের বৃহত্তম শহরগুলোর একটি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই প্রত্মতাত্ত্বিক স্থানটি মেক্সিকোর ইউকাতান রাজ্যের তিনুম পৌরসভায় অবস্থিত।
ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার
সবশেষে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরিও-তে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের সামনে গিয়ে সাত আশ্চর্যের সবই দেখার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয় সায়মনের। ১৯২১ সালে ভাস্কর্যটি তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় ফরাসি ভাস্কর পল ল্যান্ডোস্কিকে। ধীরে ধীরে এর কাজ চলতে থাকে। ভাস্করের পরিকল্পনা মাফিক প্রায় ১০ বছর পর ১৯৩১ সালে এটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ভাস্কর্যটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের প্রথম শতবার্ষিকী উদযাপন। গ্রানাইটের তৈরি এই ভাস্কর্যর্িট প্রায় ৩০ মিটার উঁচু। যে বেদিটির ওপর ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে তার উচ্চতা ৬ মিটার। মূর্তিটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন দূর থেকে দেখতে মনে হবে যিশু তার দুই হাত প্রসারিত করে শহরটিকে আলিঙ্গন করছেন। পাহাড় আর পানি দিয়ে ঘেরা রিও ডি জেনিরিও শহরের সবচেয়ে দর্শনীয় জায়গাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। যিশুখ্রিস্ট যেমন খ্রিস্টধর্মের প্রতীক, এ মূর্তিটিও তেমনি রিও এবং ব্রাজিলের প্রতীক। এরপর ৪ আগস্ট ম্যানচেস্টারে বাড়ির পথে রওনা দেন তিনি। আর এ যাত্রায় তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে ৯ হাজার ৩০০ মাইল।
