নওগাঁয় নয়-ছয়

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৪৪

মেহেদী হাসান গালিব

 

গুগল, উইকিপিডিয়া, ফেসবুক ও বিভিন্ন ট্রাভেল ব্লগ বলছে, নওগাঁয় দর্শনীয় স্থান রয়েছে ২৫টিরও বেশি। কিন্তু এতগুলো দর্শনীয় স্থান দেখতে তো হিমশিম খেতে হবে। হাতে আছে মাত্র দু-দিনের ছুটি।

তাহলে আর দেরি কিসের? আমরা পাঁচ বন্ধু সকাল ৬টায় রাজশাহী রেলগেট থেকে উঠে পড়লাম নওগাঁগামী একটি বাসে। গতরাতে ঘুম কম হওয়ায় বাসে উঠে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সবাই ঘুমের রাজ্যে। ঘুম ভাঙার পর বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি! মনে মনে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক! আবহাওয়া খুব একটা প্রতিকূলে যাবে না। কিন্তু রাস্তার পাশের একটা সাইনবোর্ডে চোখ পড়তেই চমকে গেলাম! সে কি! এক ঘুমেই নওগাঁ এসে হাজির।

মান্দা কুসুম্বা মোড় থেকেই শুরু করলাম নওগাঁ ভ্রমণ। একটি ভ্যান নিয়ে আমরা রওনা দিলাম কুসুম্বা মসজিদের উদ্দেশ্যে। মজার ব্যাপার আমরা অনেকেই কিন্তু নওগাঁ না এসেও নিজের অজান্তেই কুসুম্বা মসজিদ দেখে ফেলেছি! না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। মানিব্যাগ থেকে একটা ৫ টাকার নোট বের করে ভালো করে লক্ষ্য করুন। জ্বি, ৫ টাকার নোটের সেই মসজিদটিই নওগাঁর বিখ্যাত কুসুম্বা মসজিদ।

এই মসজিদটি খুব সহজেই যেকোনো দর্শনার্থীর নজরকাড়তে বাধ্য। মসজিদের কারুকার্য তো বটেই, পাশাপাশি মসজিদের ঠিক সামনে অবস্থিত কুসুম্বা দীঘি যেন মসজিদটির সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। কত সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ধারণা করা হয় ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে শের শাহের বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দীন বাহাদুরের শাসনামলে নির্মাণ করা হয় এই মসজিদ। এখনো কালের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই বিস্ময়টি।

মান্দা-কুসুম্বা মোড়ে এসে একটি খাবারের হোটেলে ঢুকে পড়লাম সকালের নাস্তা করার জন্য। কাউন্টারের টেবিলে রাখা একটা বাটিতে হালুয়া দেখেই মনটা আনন্দে ভরে উঠল। অর্ডার দিতেই পিচ্চি ওয়েটার মুচকি হেসে বললো, ‘ওগুলো হালুয়া না, আলু ভর্তা।’ লক্ষ্য করলাম, নওগাঁয় রুটির সঙ্গে আলু ভর্তা বেশ জনপ্রিয় একটি সকালের খাবার। এমনটা আমি অন্য কোথাও দেখিনি।

সকালের নাস্তা সেরে আমরা হাজির হলাম মান্দা ফেরিঘাটে। আরমান ভাইয়ের কথামতো খুঁজতে লাগলাম নওগাঁর জনপ্রিয় গুড়ের সন্দেশ। একজন দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে তিনি আঙুল উঁচিয়ে রাস্তার ওপারের যে দোকানটি দেখিয়ে দিলেন সেটি মূলত একটি চায়ের দোকান। মাথা চুলকাতে চুলকাতে আমরা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেতরে উঁকি দিতেই দেখলাম একজন বৃদ্ধ সন্দেশ বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নাম ফকির। তার নামানুসারেই এই সন্দেশের পরিচিতি ফকিরের গুড়ের সন্দেশ। বৃদ্ধ কড়াই থেকে এক হাতের তালু ভরে সন্দেশের মণ্ডা নিয়ে একটু একটু করে সজোরে আঁছড়ে মারতে লাগলেন টেবিলের ওপর। একই প্রক্রিয়ায় প্রথমবারের ওপর দ্বিতীয়বার সন্দেশের মণ্ডা ছুড়ে নিমিষেই বানিয়ে ফেললেন দুই স্তরের গুড়ের সন্দেশ। ব্যক্তিগতভাবে গুড় আমার অপছন্দের খাবার তালিকার একটি। কিন্তু এই গুড়ের সন্দেশ মুখে দেওয়ার পর সন্দেশ শেষ হওয়ার আগেই অর্ডার করেছিলাম আরেকটা।

মিষ্টি মুখ করে আমরা যাত্রা শুরু করলাম ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের উদ্দেশ্যে। নিয়ামতপুর উপজেলার ছোট্ট এই গ্রামটি বিখ্যাত রাস্তার দু-পাশে সারিসারি অসংখ্য তালগাছের জন্য। বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী ও তত্কালীন চেয়ারম্যান বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার ও ইউপি মেম্বার মরহুম আব্দুস সাত্তারের উদ্যোগে ১৯৮২ সালে ঘুঘুডাঙ্গার এই সড়কে রোপণ করা হয় প্রায় ৬০০টি তালগাছ। ঘুঘুডাঙ্গায় পৌঁছেই আমরা হাঁটা শুরু করি নান্দনিক তালগাছ সড়কে। সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু তালগাছ আর তালগাছ। আর সড়কের দু-ধারে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত। কী মনোরম এক দৃশ্য!

নওগাঁ ভ্রমণের পুরোটা সময়জুড়ে বিভিন্ন রাস্তার ধারে যত তালগাছ দেখেছি, তা আর অন্য কোনো জেলায় চোখে পড়েনি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, গহের আলী নামের এক বৃক্ষপ্রেমিক বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালের আঁটি সংগ্রহ করে প্রায় ২ কিলোমিটার সড়কজুড়ে রোপণ করেছিলেন প্রায় ১২ হাজারেরও অধিক তালগাছ!

এরপর ৫ পৃষ্ঠায়

তালগাছ সড়কে কিছুটা সময় অতিবাহিত করে আমরা রওনা দিলাম দিবর দিঘীর উদ্দেশ্যে। স্থানীয় লোকজনের কাছে কর্মকারের জলাশয় নামে পরিচিত এই দিঘীর সৌন্দর্য আর দশটা সাধারণ দিঘীর মতোই। তবে এই দিঘীটিকে অন্য আর দশটি সাধারণ দিঘী থেকে আলাদা করেছে যে বৈশিষ্ট্যটি, তা হলো এর মধ্যস্থলে অবস্থিত গ্রানাইট পাথরে নির্মিত আটকোণবিশিষ্ট এক স্তম্ভ।

আরো একটা দিঘীতে গিয়েছিলাম আমরা, আলতা দিঘী। এটা ধামুরহাটে। এই দিঘীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারটি হলো পথিমধ্যে ঘন শালবনের অবস্থান। সরু রাস্তার দু-ধারে সীমাহীন সবুজের সমারোহ, থেকে থেকেই দু-একটি উইপোকার বিশালাকার ঢিবি, গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠা নীরবতা, সব মিলিয়ে যেন সৃষ্টি করেছে অন্যরকম এক আমেজ। হাতে খুব একটা সময় না থাকলেও এই ঘন সবুজ বনে ছবি তোলার লোভ সামলানো গেল না।

বাংলাদেশ-ভারত সীমানা ঘেঁষা প্রায় ১ কিলোমিটার লম্বা এই দিঘীটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ফুটে থাকা লাল পদ্মফুল। নওগাঁ যাওয়ার আগে ইন্টারনেটে আলতা দিঘীর বেশকিছু ছবি দেখে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম কখন নিজ চোখে দেখতে পাবো।

এবার আমরা অগ্রসর হলাম দিনের শেষ দর্শনীয় স্থান পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের উদ্দেশ্যে। খানিকটা দূর থেকেই যখন পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার আমাদের চোখের সীমানায় ধরা দিলো, তখন সূর্যের আলো অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। আকাশ তার নীল রঙ হারিয়ে ধারণ করতে শুরু করেছে গোধূলির লাল আভা। আমরা তড়িঘড়ি করে টিকেট কেটে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের ভেতরে ঢুকলাম। অষ্টম শতকের শেষদিকে কিংবা নবম শতকে এই বিহার নির্মাণ করেন পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল দেব। পরবর্তীতে ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে এটি আবিষ্কার করেন স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর মহাবিহারের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক তাত্পর্য ব্যাখ্যা করতে গেলে পুরোদস্তুর একটি বই লিখে ফেলা সম্ভব।

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ঘুরে আমরা ফিরে আসি নওগাঁ শহরে। রাতে নওগাঁর জনপ্রিয় সাব্বিরের বিরিয়ানি খেয়ে ক্লান্ত দেহটাকে এলিয়ে দিলাম বিছানায়। কিন্তু ঘুম কী আর এত সহজে ধরা দেয়? সবটুকু ঘুম যে বাস আর অটোরিকশাতেই দিয়ে এসেছি আমরা। তাই মাঝরাত অবধি চলে আড্ডা।

পরদিনের গন্তব্যস্থল মাত্র দুটি। গান্ধী আশ্রম আর রবীন্দ্রনাথের কাছারি বাড়ি। হোটেল থেকে কিছুদূর হেঁটে সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে একটি সিএনজি রিজার্ভ করে রওনা দিই গান্ধী আশ্রমের উদ্দেশ্যে। ১৯২৫ সালে ভারতবর্ষের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা মহাত্মা গান্ধী অসহায় মানুষদের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করার জন্য আত্রাই এসেছিলেন। সে সময় তিনি যে মাটির বাড়িটিতে অবস্থান করেছিলেন সেটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে আজকের গান্ধী আশ্রম। ভারতের অর্থায়নে আশ্রমের ভেতরে পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয়েছে মহাত্মা গান্ধী ও পিসি রায় মেমোরিয়াল হল।

গান্ধী আশ্রম থেকে আমরা রওনা দিই রবীন্দ্রনাথের কাছারি বাড়ির উদ্দেশ্যে। যদিও কিছুদূর পরপরই ভাঙা রাস্তার ঝাঁকুনি খেতে হচ্ছিল, তারপরও আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর রাস্তাগুলোর তালিকায় থাকবে এটি। কখনো বা রাস্তার দু-ধারে বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত, যা মিশে গেছে দূরের আকাশে, কখনো বা আবার সারিসারি দোতলা মাটির বাড়ি। আত্রাই থেকে কাছারি বাড়ির ভ্যান দূরত্ব মোটামুটি ১ ঘণ্টার। কিন্তু রাস্তার ঝাঁকুনির কথা ভুলে গেলে যাত্রাটা বেশ উপভোগ্যই ছিল। অতঃপর আমরা পৌঁছে গেলাম রবীন্দ্রনাথের কাছারি বাড়ি।

কাছারি বাড়িটা গতানুগতিক জাদুঘর ধাঁচের মতো মনে হলো। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহূত সরঞ্জামাদি, তখনকার সময়ের বেশকিছু আলোকচিত্র ও ফটো ফ্রেমে বাঁধাই করা রবীন্দ্রনাথের লেখা ও গানের বিভিন্ন লাইন। সঙ্গে মৃদুস্বরে বাজছিল রবীন্দ্রসংগীত।

তবে কাছারি বাড়ি গিয়ে নতুন যে বিষয়টি জানলাম তা হলো কাছারি বাড়ি আর কুঠিবাড়ির পার্থক্য। আগে ভেবেছিলাম এই দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু কাছারি বাড়িতে কর্মরত একজনের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, কাছারি বাড়ি ব্যবহূত হতো শুধুমাত্র খাজনা আদায়ের জন্য। আর কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেছিলেন।

 

ছবি :লেখক