বাঁদুড় বাড়ির কথকতা

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৪৫

মো. আমিরুজ্জামান

 

দিনের আলোয় নয়, রাতে চলাচল করে। যে কারণে নাম তার নিশাচর। কেউ কেউ বলে বাঁদুড়। আর এই বাঁদুড়ের বাড়ি বা অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে নীলফামারীর সৈয়দপুরের বাঙালিপুর ইউনিয়নের ভগতপাড়ায়। পাখির মতো উড়লেও আকৃতির কারণে বাঁদুড়ের কদর নেই। নানা কল্প-কাহিনির আতঙ্ক সৃষ্টিকারী প্রাণী হিসেবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাই সৈয়দপুর নিভৃত পল্লীতে নির্ভয়ে আবাস গড়ে তুলেছে হাজার হাজার বাঁদুড়।

জানা যায়, দেড় শতাধিক বছর আগে এই এলাকার প্রায় ৩ একর জমির বাঁশঝাড় ও দুটি প্রাচীন বটগাছে বাঁদুড়ের বসবাস শুরু হয়। সংখ্যালঘু এই এলাকায় সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে বাঁদুড়কে গ্রহণ করায় বংশ বৃদ্ধি ঘটে চলছে বছরের পর বছর ধরে। কয়েক যুগে তাই লাখে দাঁড়িয়েছে এখানকার বাঁদুড়ের সংখ্যা। এভাবে এলাকাবাসীর সহায়তায় এ এলাকাটি বাঁদুড়ের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বছরজুড়ে বাঁশঝাড় আর দুটো বটগাছে নীরবে বসবাস করছে তারা। এসব বাঁদুড়ের কিচিরমিচির ডাকে সারাক্ষণ কোলাহলপূর্ণ থাকে এলাকাটি। তবে রাতে খাদ্যের অন্বেষণে আবাস ছাড়ে বাঁদুড়গুলো। দূর-দূরান্ত থেকে ফেরার পর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আবারো শুরু হয় তাদের কলকাকলি। এতে এলাকাবাসীর ঘুম ভেঙে যায়।

ভগতপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, এলাকার জনশ্রুতি অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী খ্যাত মিলিত বট-পাকুর গাছের শাখা-প্রশাখায় তাদের হুকের মতো পা দুটো আটকিয়ে চুপিসারে ঝুলছে। মাথায় হলুদ রঙ থাকলেও পুরো দেহটি কালো। পালক ছাড়া চামড়ায় নীরব স্থানে ঝুলে থাকা দেখে মনে হয় রাতের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর যেন তারা শুধু একটু প্রশান্তির ঘুম খুঁজছে।

এলাকাবাসী জানান, কখন, কীভাবে এখানে বাঁদুড় বসবাস শুরু হয়েছে এ প্রজম্মের কেউ তা জানেন না। তবে ঝুলন্ত অবস্থায় তারা বিশ্রাম, ঘুম ও বাচ্চা জন্মদানের মতো কাজগুলো করে। এখানকার বাঁদুড় দেখার জন্য প্রতিদিন দর্শনার্থীরা আসেন। তারা জানান, এখানে  প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে আবাস গড়ায় বাঁদুড় বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এ গ্রামটি। তবে এলাকায় কুসংস্কারেরও কমতি নেই এ বাদুড় নিয়ে। অনেকে সৌভাগ্যের চিহূ মনে করলেও আবার অনেকে তাদের প্রাণনাশে ব্যস্ত থাকেন।

বাঙালিপুর ইউপি চেয়ারম্যান প্রণোবোস বাগচী বলেন, ‘বাঁদুড় নিরীহ প্রাণী। এরা মাটিতে পড়ে গেলে আর উঠতে পারে না। মাটিতেই মারা যায়। এদের পা নেই। তবে পেটের নিচে দুটো হুক আছে। এ দিয়েই তারা ঝুলে থাকে। এরা তেমন একটা মানুষের ক্ষতি করে না। সারাদিন ঘুমায়, সন্ধ্যায় বেড়িয়ে যায় আহারের সন্ধানে।’

শিক্ষক প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেন, ‘স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে বাঁদুড় দ্বিতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী এবং এরাই একমাত্র উড়তে পারে। এদের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত কম। তাই চলাচলের সময় ক্রমাগত মুখ দিয়ে শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করে আশেপাশের সম্ভাব্য বাঁধা-বিপত্তি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে এগিয়ে চলে। আকৃতি আর অবস্থানের কারণে ভ্রান্ত ধারণা বা কুসংস্কার রয়েছে এ নিরীহ প্রাণীটিকে নিয়ে। অনেকে সুযোগ পেলে হত্যাও করে। এগুলো বন্ধ করা উচিত।’

স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বনাথ জানান, এর মাংস খেলে হাঁপানি রোগ ভালো হয়।—এই অজুহাতে অনেকে আসেন বাঁদুড় মারতে। তবে বাঁদুড় নিয়ে নানা গল্প-কাহিনির আলোকে এলাকায় আতঙ্কও রয়েছে। যেমন—বাঁদুড় চোখে দেখে না তাই মানুষের রক্ত খায়, তার ঘরে প্রবেশ হচ্ছে অশুভ লক্ষণ।

এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাণী হিসেবে বাঁদুড় প্রকৃতিতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না এ কথাটি সত্যি না। বরং পরাগায়ণের মাধ্যম হিসেবে বাঁদুড় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, কলা আর অ্যাভভাকোডা প্রায় ৩০০ রকমের গাছের বীজ ছড়াতে সাহায্য করে বাঁদুড়। এছাড়া বাদুড় কীটপতঙ্গ খেয়ে এগুলোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ফসল রক্ষা করে।

ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক ড. আশরাফুল কবীর জানান, এদের প্রচলিত নাম ভারতীয় উড়ক্কু। এরা পাকা আম, কলা, লিচু, ফুলের মধু, পায়রা, ডুমুরসহ অন্যান্য ফলমূল খেয়ে থাকে। দলবেঁধে বট, ডুমুর ও তেঁতুল জাতীয় গাছে একসঙ্গে বসবাস করে। পানির উত্সর পাশাপাশি আবাসস্থলে তারা বেশি থাকে। এরা রাতে সক্রিয় থাকে। পুরুষ বাঁদুড়গুলো অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করে, আশ্রয়স্থল ও সহযোগী স্ত্রী বাঁদুড়গুলোকে বহিরাগতদের থেকে রক্ষা করে। স্তন্যপায়ী এ প্রাণী আকাশে উড়ে বেড়াতে পারলেও এটি কোনো পাখি নয়। পৃথিবীর একমাত্র উড্ডয়ন ক্ষমতা বিশিষ্ট স্তন্যপায়ী প্রাণীটি পৃথিবীজুড়ে বিচরণ করছে। প্রায় ১১০০ প্রজাতির বাঁদুড় রয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে বাঁদুড়ের সংখ্যাই ২০ ভাগ। এর মধ্যে ৭০ ভাগ বাঁদুড় পতঙ্গ-ভুক। বাকিরা ফলমূল খায়।

সম্প্রতি কিছু অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, দেশে দেশে মানুষের মতোই ভাষা বদলায় বাঁদুড়। সে দেশের বাঁদুড়রা স্থানীয় ভাষাতেই কথার্বাতা চালায়। তাহলে বাংলাদেশের বাঁদুড় হয়তো বাংলা ভাষায় কথা বলে!

পাখি ও পরিবেশ সুরক্ষায় জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেতুবন্ধন যুব উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে আমরা পাখি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করছি। সৈয়দপুর ছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, চিরির বন্দর, তারাগঞ্জ, নীলফামারী সদর, কিশোরগঞ্জ এলাকায় পাখির নিরাপদ বাসস্থানের জন্য গাছে গাছে কলস বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সৈয়দপুরে ৫টি পাখির অভয়াশ্রম রয়েছে। এরমধ্যে ভগতপাড়ায় বাঁদুড়ের অভয়াশ্রমটি আমার সংগঠনের সদস্যরা দেখভাল করছেন।’

এ প্রসঙ্গে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) এস এম গোলাম কিবরিয়া জানান, সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সাময়িক পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি জায়গা পাখির অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।