শিফারুল শেখ
গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ব্রিটেনে এখন একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহলো ব্রিটেনে ক্ষমতাধর কে? পার্লামেন্ট বা এমপি, প্রধানমন্ত্রী নাকি সুপ্রিম কোর্ট? উত্তর মিলবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যে রায়ই দিক তাতে কি ব্রেক্সিট নিয়ে দেশটির বর্তমান অচলাবস্থা কেটে যাবে? এক কথায় বলা যায়, না। কাটলেও সেটা খুব সহজ নয়। কারণ সুপ্রিম কোর্টের মামলাটি ঐতিহাসিক যা সচরাচর ঘটে না। শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতিসহ ১২ জন বিচারকও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন তারা আসলে কোনিদকে যাবেন। এরই মধ্যে ইংল্যান্ডের আদালত পার্লামেন্ট স্থগিতে সরকারের পক্ষে এবং স্কটিশ আদালত বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে উভয় আদালতের যুক্তিকে বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সর্বোচ্চ আদালতকে।
কে হবেন ক্ষমতাবান?
শীর্ষ আদালতে ১২ জন বিচারকের মধ্যে বেশিরভাগই ইংলিশ, দুই জন স্কটিশ, এক জন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড এবং এক জন ওয়েলসের। এদের মধ্যে প্রধান বিচারপতিসহ নারী আছেন তিন জন। ইংলিশ বেশি হওয়ায় বিচার প্রভাবিত হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে। প্রধান বিচারপতি নিজেই স্বীকার করেছেন, এই রায়টা সহজ নয়। তাই ভেবেচিন্তে যতো দ্রুত সম্ভব সিদ্ধান্ত জানানো হবে। রায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পক্ষে গেলে এমপিরা হেরে যাবেন। অর্থাত্ পার্লামেন্ট স্থগিত রেখেই চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন বরিস। আর হেরে গেলে সুপ্রিম কোর্ট এবং পরের ক্ষমতাধর হবেন এমপিরা। সেক্ষেত্রে পার্লামেন্টের অধিবেশন আবার ডাকতে হবে। তাহলে এমপিরা আর চুক্তিহীন ব্রেক্সিট করতে দেবেন না। এমন কী বরিসকে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্যও বরণ করতে হতে পারে।
দুঃস্বপ্ন কাটছে না
ব্রিটেনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে যার প্রভাব অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবারকে আঘাত করছে। লুক্সেমবুর্গের প্রধানমন্ত্রী ব্রেক্সিটকে ঘিরে বর্তমান অচলাবস্থাকে দুঃস্বপ্ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সেই মূল্যায়ন কতটা যথার্থ, তা টের পাওয়া যাচ্ছে। চারিদিক থেকে প্রবল চাপ সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার এখনো আইরিশ সীমান্তে ব্যাকস্টপ ব্যবস্থার কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প প্রস্তাব পেশ করতে নারাজ। এমন কী ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি দেশ ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আন্টি রিনে চলতি মাসের শেষের মধ্যে এই মর্মে লিখিত প্রস্তাব পেশ করার সময়সীমা স্থির করে দেওয়া সত্ত্বেও বরিস জনসনের সরকার সেই হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরিস জনসন একাই অগ্রগতির দাবি করে আসছেন। ইইউর সব নেতাই একবাক্যে জানিয়েছেন, জটিলতা কাটাতে বিন্দুমাত্র অগ্রগতি হয়নি।
আগামী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে ব্রেক্সিট সংক্রান্ত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। উপস্থিত নেতাদের চুক্তিসহ ব্রেক্সিট, চুক্তিহীন ব্রেক্সিট অথবা ব্রেক্সিটের সময়সীমা বাড়ানর মধ্যে একটি পথ বেছে নিতে হবে। কিন্তু ইইউ কর্মকর্তারা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তার আগে ব্রিটেন কোনো সমাধানসূত্র পেশ না করতে পারলে সেই প্রস্তাব খতিয়ে দেখার যথেষ্ট সময় (৩১ অক্টোবর ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হওয়ার শেষ সময়) থাকবে না। সেক্ষেত্রে ইইউ শীর্ষ নেতারা শেষ মুহূর্তে সেই প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারবেন না। অথচ ব্রিটেন সেই চাপ উপেক্ষা করে সময়সীমার গুরুত্ব স্বীকার করতে চাইছে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র বলেছেন, প্রস্তাব হলে তবেই তা পেশ করবে লন্ডন, এক্ষেত্রে কোনো কৃত্রিম সময়সীমা মানা হবে না। ব্রাসেলস যখন আরো গঠনমূলক সুরে কথা বলবে, তখনই এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মোটকথা নিজস্ব দায়িত্ব পালন করার বদলে ব্রিটিশ সরকার ইইউর উদ্দেশ্যে সৃজনশীলতা ও নমনীয়তা দেখানোর ডাক দিচ্ছে। ব্রেক্সিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিটিশ মন্ত্রী স্টিফেন বার্কলের মন্তব্যও একই।
ইইউর প্রধান ব্রেক্সিট মধ্যস্থতাকারী মিচেল বার্নিয়ে চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। ইইউ পার্লামেন্টে ব্রিটেনের ব্রেক্সিটপন্থি সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা বলতে চান না বটে, কিন্তু এর পরিণতি আরো অনেক বেশি গুরুতর ও সংখ্যায় আরো বেশি হতে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে আলোচনার ভান না করে দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তরিকভাবে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবার পরামর্শ দেন বার্নিয়ে।
জার্মানির এক সংবাদপত্রের সূত্র অনুযায়ী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ইইউর সঙ্গে বোঝাপড়ার লক্ষ্যে গোপনে এক সমাধানসূত্র প্রস্তুত করছেন। কিন্তু ইইউ পার্লামেন্ট ব্যাকস্টপ ছাড়া ব্রেক্সিট চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তবে ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ জাঙ্কার ব্রিটেনের স্কাই টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে আবার খোলসা করে বলেন, আইরিশ সীমান্তে জটিলতা কাটাতে সব লক্ষ্য পূরণ হলে ব্যাকস্টপের আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না। এখনো দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
