‘তিন দশক ধরে বলাবলি হচ্ছে ব্রিজ হবে, ব্রিজ হবে। কত সাংবাদিক, চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য এলেন। তারা আসেন, দেখেন, চলে যান। ক্ষমতার বদল হলো। ক্ষমতা পাওয়ার পর প্রতিশ্রুতি দেন অনেকেই। কিন্তু ব্রিজ আর হয় না। অথচ ব্রিজটি আমাদের খুবই দরকার’—আক্ষেপ করে কথাগুলো বললেন আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার ধলেশ্বরী নদীর পাশে বরাইদ এলাকার বাসিন্দা আলমগীর। তার কথাগুলো বরাইদসহ আশপাশের দশ গ্রামের মানুষের মনের কথা। এই একটি ব্রিজের জন্য আটকে আছে তাদের গ্রামসহ আশপাশের ২৫টি গ্রামের লাখো মানুষের স্বপ্ন। ইউনিয়ন পরিষদের খুব কাছে হলেও এই একটি ব্রিজের কারণে পিছিয়ে আছে গ্রামটি। কাজের প্রয়োজনে ধলেশ্বরী নদীর ওপারে সাটুরিয়া ও পাশ্ববর্তী নাগরপুর উপজেলায় যাতায়াত বেশি বরাইদ গ্রামের মানুষের। কিন্তু বিকল্প পথ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পথেই যাতায়াত করেন তারা। প্রায়ই ঘটে নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনা। মারা যায় মানুষ। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ এখন আশপাশের মানুষের দাবি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদী পার হয়ে ওপারে যাওয়ার জন্য ঘাটে আছে মাত্র একটি ছোট নৌকা। সকালে নৌকায় করে পারাপার হতে গেলে সিরিয়াল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেই ছোট্ট নৌকা দিয়েই প্রতিনিয়ত হাজারো গ্রামবাসী, শিক্ষার্থী, পোশাককর্মী, ব্যবসায়ীরা যাতায়াত করেন। নদীর দুই ঘাটেই নৌকায় উঠতেও প্রতিনিয়ত আহত হচ্ছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। নৌকা এক পাড় ছেড়ে অন্য পাড়ে গেলে তা ফিরে আসার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় অন্য যাত্রীদের।
ফয়জুননেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কামরুল ইসলাম সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাসে যায়। সে প্রায় প্রতিদিনই এই খেয়া নৌকা দিয়েই পারাপার হয়। সে আক্ষেপ করে বলে, আপনারা তো আসেন, দেখেন, ছবি তোলেন আর চলে যান। আপনাদের মতো অনেকেই এখানে আসেন কিন্তু আমাদের ব্রিজ তো হয় না। ব্রিজটি হলে আমাদের যে কি উপকার হবে বলে বোঝাতে পারব না। আবহাওয়া একটু খারাপ হলেই নৌকা চলে না। আর সেদিন স্কুলে যাওয়াও হয় না।
বরাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, শুধু এ ব্রিজটির জন্য আমাদের এলাকাটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বরাইদ একটি কৃষিপূর্ণ গ্রাম, এখানের উত্পাদিত কৃষিপণ্যও ব্রিজের অভাবে বাজারজাত করতে পারে না কৃষকরা। এছাড়াও বরাইদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের সুনাম রয়েছে সারা দেশেই। এখানকার তৈরি শাড়ি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ব্রিজটির মাপজোখসহ প্রাথমিক কাজ করা হয়েছে। এখন সয়েল টেস্ট হবে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই ব্রিজটির কাজ শুরু হবে।
ব্রিজ তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সম্প্রতি ঐ এলাকা পরিদর্শনে আসেন বুয়েটের দুই সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। বুয়েটের অধ্যাপক মো. শাহজাহান মণ্ডলের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিশেষজ্ঞ দলটির আসার খবরে ব্রিজের দাবিতে হাজারো মানুষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অধ্যাপক মো.শাহজাহান মণ্ডল বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্রিজটি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, বরাইদ ঘাটে ব্রিজের গুরুত্ব অনেক বেশি। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ টিম এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাদের ডিজাইন পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব যাতে এটি টেন্ডারে যায়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
