ভ্রমণপিয়াসী পাঠকের আনন্দময় অবগাহন

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:১৮

বাংলাদেশের অন্যতম ভ্রমণকাহিনি লেখক হলেন ফারুক মঈনউদ্দীন। তার রচিত ‘নির্ঘুম নিউ ইয়র্ক’—বইটি পড়ে মুগ্ধ হলাম।

গ্রন্থটির শুরুতেই আমেরিকার দূতাবাসের অফিস, ভিসাপ্রার্থীদের ভিড়, প্রহরী ও অফিসারদের আচরণ খুঁটিনাটি সবই লেখক বর্ণনা করেছেন। বিদেশে গমনের খবর শুনলে আত্মীয়স্বজনের বিবিধ উপদেশ পাওয়ার সাধারণ বিষয়টাকেও লেখক তুলে ধরেছেন রসাত্মকভাবে।

‘এক গাধা নাকি একটা নদী পেরোতে চাইছিল। হাতি বলল, নদী মোটেই গভীর নয়, হরিণ বলল, খুবই গভীর। বেচারা গাধা হরিণের কথা বিশ্বাস না করে হাতির কথা শুনে প্রায় ডুবে মরতে বসেছিল। এত সব মাথা গুলিয়ে ফেলা উপদেশের মাঝামাঝি গিয়ে গুচ্ছের টাকা খরচ করে কিনলাম গলাবন্ধ সোয়েটার, জামার ভেতরে পরার জন্য থার্মাকট গেঞ্জি, মাফলার ইত্যাদি।’

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের গোল্ড ভল্ট পরিদর্শনের বর্ণনা পড়তে গিয়ে আমরা জেনে ফেললাম সোনা ও স্বর্ণমুদ্রা ব্যবহারের ইতিহাস।

‘সেই কখন, খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে সোনার ব্যবহার শুরু হয়েছিল, সে ধারা আজ পর্যন্ত অমলিন। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় (অর্থাত্ আজকের ইরাক, সিরিয়া) সুমেরীয়রা সর্বপ্রথম সোনার ব্যবহার শুরু করে পবিত্র ধাতু, অলঙ্কার এবং সাজসজ্জার উপকরণ হিসেবে।’

ইটালীয় রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে লেখক পরিচিত হন জ্ঞানেন কুমারের সঙ্গে। যার চেহারা ভারতীয়। কিন্তু আসলে সে ফিজির নাগরিক। এরপরই লেখক আমাদের জানিয়ে দিলেন জ্ঞানেনের চেহারা দেখতে ভারতীয় মনে হওয়ার কারণ।

‘এককালের ব্রিটিশ উপনিবেশ ফিজিতে আখের জমিতে কাজ করার জন্য প্রায় জোর করে নিয়ে যাওয়া ভারতীয় শ্রমিকদের বহনকারী প্রথম জাহাজটা ওখানে পৌঁছায় ১৮৭৯ সালে। তারপর থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৮৭টি জাহাজভর্তি ভারতীয় শ্রমিক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফিজিতে। যে শর্তে এবং পরিবেশে তাদের কাজ করতে হতো সেটা ছিল ক্রীতদাস প্রথারই নামান্তর। ভাবছিলাম জ্ঞানেনের পূর্বপুরুষদের এসব জাহাজের কোনো একটিতে করে ফিজিতে আনা হয়েছিল।’

ফারুক মঈনউদ্দীন যেখানেই গিয়েছেন সেখানকার সামগ্রিক ইতিহাস পাঠকের সামনে তুলে ধরা তার লেখনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জাতিসংঘের সদর দপ্তর ঘুরতে গিয়ে লেখক আমাদের জানিয়ে দিলেন জাতিসংঘ গঠনের ভিত্তি, এর কর্মকাণ্ড আর এই ভবনটি তৈরির সকল খুঁটিনাটি বিষয়।

‘সদর দপ্তর নির্মাণের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে আট কোটি ডলার। কিন্তু তত্কালীন মহাসচিব ট্রাইভে লি’র নির্দেশে প্রাক্কলিত নির্মাণ ব্যয় সাড়ে ছয় কোটি ডলারে নামিয়ে আনা হয়। এটি করতে গিয়ে সচিবালয় ভবনের উচ্চতা ৪৫ তলা থেকে কমিয়ে ৩৯ তলায় নির্ধারণ করা হয়।’

ডেট্রয়েট সিটিতে ঘুরতে গিয়ে শহরটির সামগ্রিক দিক লেখক উপস্থাপন করেছেন। আর সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গদের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার ইতিহাস সবই লেখক গল্পের মতো করে জানিয়ে গেছেন সহজ-সাবলীল ভাষায়।

‘১৯৪৩ সালে বোমারু বিমানের ইঞ্জিন উত্পাদনকারী প্যাকার্ড প্ল্যান্টের তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকের পদোন্নতির প্রতিবাদে কারখানায় ২৫ হাজার শ্রমিক ধর্মঘট আহ্বান করে।’

তার লেখনীর ভাষা খুবই প্রাঞ্জল, সরস আর গতিময়। ছোটগল্প লেখার অভিজ্ঞতা তিনি ভ্রমণকাহিনিতে সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন। ফারুক মঈনউদ্দীন যেখানেই গিয়েছেন সেখানে যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি থেকে গল্প শুরু করেছেন। তারপর যাওয়ার রাস্তা, থাকার স্থান, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্, খাবার, আড্ডা, সেখানকার বিশেষ সব স্থানের তথ্য ও ইতিহাস, আর স্থানটির চমত্কার বর্ণনা দিয়ে পাঠকদের মনোযোগ ও আগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। একারণেই একজন ভ্রমণকাহিনিকার হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।