রাষ্ট্র সমাজ সংসার কবে প্রবীণবান্ধব হবে?

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৪

বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলাদেশের পারিবারিক সমীকরণ বদলে গেছে অনেকটাই। স্বামী যখন নিউ ইয়র্কে অফিস যাওয়ার আগে ব্রেকফার্স্ট সারছেন, স্ত্রী হয়তো তখন সবে অফিস থেকে ফিরে মেয়েকে নিয়ে বসছেন হোমওয়ার্ক করাতে। বিশেষ কোনো প্রজেক্টের জন্য, ফেলোশিপ, পিএইচডি কিংবা চাকরির সূত্রে ছয় মাস থেকে এক বছর, কখনও দুই-তিন বছরও দুই জনের এক জনকে কখনো দুই জনকেই দেশের বাইরে থাকতে হয় পরিবর্তিত বাস্তবতায়। দুই জন দুই শহরে, এমনকী দুই জন দুই দেশে থেকে ক্যারিয়ার তৈরিতে আপত্তি নেই অনেকেরই। এই মনস্তত্ত্ব বাংলাদেশের সমাজের জন্য উপযোগী কি উপযোগী নয়, এর উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন মাত্রার এই জীবনযাপনের কারণে বেশ কিছু সামাজিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সেসব নিয়ে যে ভাবা দরকার আমরা কেবল সেদিকে একটু মনোযোগী হওয়ার অনুরোধ করছি। স্বামী স্ত্রী দুই জন যখন দুই শহরে তখন পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা কোথায় থাকবেন, কার সঙ্গেই বা থাকবেন? কে তাদের সঙ্গ দেবেন? কার সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেবেন? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৃদ্ধাশ্রম সমাধান নয়। পশ্চিমাদের মনস্তত্ত্ব প্রাচ্য থেকে ভিন্ন। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ ধারণাটি তাদের কাছে প্রাচ্যের মতো নিষ্ঠুর নয়। পশ্চিম এ আবেগ থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। আমাদের দেশে দুই-এক লাখ টাকার জন্যই যেখানে একা থাকা বর্ষীয়ানদের হত্যা করা হয়, সেখানে আরো নানা সমস্যা আছে একাকী বৃদ্ধদের জন্য। পশ্চিমে বয়স্কদের নিরাপত্তার পরিবেশ সব অর্থেই প্রাচ্যের তুলনায় যথেষ্ট ভালো। সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য রয়েছে শত শত বীমা পলিসি। বিশেষ করে মেডিকেল পলিসি (৬০ থেকে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত) খুবই জনপ্রিয়। ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত পলিসি রিনিউ করার সুযোগও রয়েছে। পলিসি হোল্ডারদের জন্য আছে সব ধরনের সুবিধা। আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো তার সিনিয়র সিটিজেনদের শতভাগ দায়িত্ব পালন করছে, সরাসরি। আমরা পশ্চিমের অনেক ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছি, তাদের মতো জীবনযাপনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি কিন্তু তারা যে সমস্যাগুলোকে সুস্থ এবং স্বস্তিকর পথে মোকাবিলা করছে সেদিকে আমাদের মনোযোগ সামান্যই। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম আমরা প্রোগ্রামিংয়ে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছি কিন্তু ডাটা সুরক্ষার জন্য ফায়ারওয়ালে দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে। তথ্য সুরক্ষার জন্য নির্ভর করে আছি বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর। পশ্চিমের যাপিত জীবন এবং মূল্যবোধকে আংশিক গ্রহণ করতে পারছি কিন্তু পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারছি না। হতে পারে আমাদের দেশে সমস্যাটি নতুন। সেকারণে এই জীবনযাপনের উপজাত সমস্যা সম্পর্কে আমরা অতটা সজাগ নই। যৌথ পরিবারের ধারণা ভেঙে অনু পরিবার গড়ে ওঠা এবং সেই অনু পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুই জনের কর্মজীবী হওয়ার চিত্র খুব বেশি দিনের নয়। চার দশক আগেও যৌথ পরিবারের ভিত্তি এখানে এত মজবুত ছিল যে বাবা-মা কোথায় থাকবেন তা নিয়ে ভাববার প্রয়োজনের কথা কেউ কল্পনাও করেনি। পরিবারে যিনি যত বৃদ্ধ হবেন পরিবারে তার প্রতাপ তত দোর্দণ্ড হবে, ষাটের দশক পর্যন্ত এটাই ছিল বাঙালি মধ্যবিত্তের সাধারণ চেহারা। হতে পারে বাস্তব প্রয়োজনেই হয়তো নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে যৌথ পরিবারের ভিত। হতে পারে আমাদের ধ্রুপদী মূল্যবোধে কিছুটা হলেও ফাটল ধরেছে। প্রাচ্য দেশে সকলে সত্যজিত্ রায় নয় যে তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে পরিবারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড। সফল বর্ষীয়ানদের মতো বর্ণাঢ্য আলোকময় ঈর্ষণীয় ভাগ্য হয় না সব বৃদ্ধের।

দুই.

বয়স অনেকটা উড়ন্ত শিমুল তুলোর মতো। ধরতে গেলে দূরে সরে যায়। এক সময়ের নেহাত্ ‘ছেলেটা’ দেখতে দেখতে কেমন করে ‘লোক’ হয়ে যায়। ছেলে থেকে লোক, লোক থেকে পৌঢ় হয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া যেন ঘটে যায় চোখের নিমিষে। প্রৌঢ় ব্যাপারটা কী? পড়ন্ত শব্দ থেকে এসেছে প্রৌঢ়। কিন্তু প্রৌঢ়রা কি আসলেই পড়ন্ত? পাদপ্রদীপের আলোয় যারা আছেন তাদের কথা থাক। সাধারণ বৃদ্ধের কথাই বলি। কেবল মুখের রেখা আর চুলের শুভ্রতা দিয়েই কি বিচার করব প্রৌঢ়ত্ব? জীবন মানে তো কেবল একটি নিখুঁত শরীর নয়। আরো অনেক কিছু। একজন বর্ষীয়ানের অভিজ্ঞতা জীবনকে নানা দিক থেকে মোকাবিলার সক্ষমতার গল্প অপেক্ষাকৃত কম বয়স্কদের জন্য সবসময়-ই বনষ্পতির ছায়ার মতো। সমস্যা কোন বয়সের নেই? সমাজতাত্ত্বিকরা তো বলছেন এই একুশ শতকে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপের মধ্যে থাকে শিশুরা। বয়ঃসন্ধিকাল, তারুণ্য, মধ্যবয়স সব বয়সেই বিশেষ কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বার্ধক্যের সমস্যা একেবারে দুর্বহ কিছু নয়। বার্ধক্যের বেশির ভাগ সমস্যারই আদ্যাক্ষর ‘ড’। ডিমেনশিয়া, ডিলিরিয়াম, ডিপ্রেশন। ডিমেনশিয়ায় মনে রাখার ক্ষমতা কমতে থাকে। ডিলিরিয়ামের অর্থ চিত্তবিকার। বার্ধক্যে দেখাশোনার ভুলভ্রান্তি লেগেই থাকে। ঘরের মধ্যে কেউ নেই কিন্তু মনে হচ্ছে কেউ কথা বলছে, এমন সমস্যা অনেক বয়স্কদের থাকে। অন্যদের কাছে মনে হয় তিনি প্রলাপ বকছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বয়স্কদের উত্কণ্ঠার সবচেয়ে বড়ো কারণ আর্থিক নিরাপত্তার অভাব এবং নিঃসঙ্গতা। বার্ধক্যে স্বামী কিংবা স্ত্রী একে অন্যকে হারালে এই উত্কণ্ঠা বেড়ে যায় বহু গুণ। ভেবে দেখুন, একটা সময় ছিল যখন তারা আপনারই জন্য সারা রাত জেগে কাটিয়েছেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাইয়েছেন, ন্যাপি বদলে দিয়েছেন, সর্দি কাশির আভাস মিললেই ছুটে গেছেন ডাক্তারের কাছে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে নানা বায়না আর কথায় কথায় টেম্পার ট্যানট্রাম সামলেছেন। বেস্ট ফ্রেন্ডের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তারও মধ্যস্থতা করে দিয়েছেন। সেই বাবা-মাই যখন বৃদ্ধ বয়সে সঙ্গের জন্য আপনার ওপর নির্ভরশীল, আপনি তখন লেফট ওভার ভাবছেন। নিজের সন্তানের কাছে বন্ধু এবং প্রিয় হওয়ার জন্য যত রকম চেষ্টা আপনার তার পাঁচ শতাংশও কি বাবা-মায়ের জন্য আছে? বার্ধক্য মূলত দ্বিতীয় শৈশব। আমাদের মধ্যে যারা বাবা-মাকে এই দ্বিতীয় শৈশবে পাই তারা যদি এই দ্বিতীয় শৈশবের একাকিত্ব, মানসিক অবসাদ এবং নিরাপত্তাহীনতাকে পাশে থেকে একটু মানসিক সমর্থন দিই, তাহলে বড়ো একটি সামাজিক সমস্যার সমাধান হয়। চাইলেই আমরা তাদের জন্য একটু গান শোনা, বই পড়া, পুরোনো সিনেমা দেখা কিংবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করিয়ে দিতে পারি। বাবা-মাকে হারানোর পর অনেকের মুখেই বাবা-মার জন্য এসব কিছু না করার অনুতাপের কথা শুনি। যিনি হারান তিনিই কেবল বোঝেন এই আক্ষেপ আফসোস আর কোনো দিনই পূরণ হওয়ার নয়। এই লেখা সেই ভাগ্যবানদের জন্য যাদের কাছে বাবা-মা দুই জন বা অন্তত এক জন আছেন।  

n লেখক : নিবন্ধকার