হাসান ইমাম
আমাদের প্রাণের শহর ঢাকার ‘প্রাণ’ যে ওষ্ঠাগত—এ কথাটিই দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) ঘুরেফিরে আরেক দফায় উচ্চারণ করল। তাদের হালনাগাদ জরিপে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান নিচের দিক থেকে ৩ নম্বর। ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থায় সিরিয়ার দামেস্ক আর নাইজেরিয়ার লাগোস।
অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত একটি দেশের রাজধানীর দুরবস্থা আলাদা করে পরিমাপ অর্থহীন; তালিকার শীর্ষে তাই দামেস্কের না থাকাটাই হতো বরং আশ্চর্যের। আর আফ্রিকার গরিবগুরবো দেশ নাইজেরিয়া সম্পর্কেও সবার ধারণা কমবেশি পরিষ্কার। প্রশ্ন হলো ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ দেশের রাজধানীর কেন রুগ্ণ দশায়?
রাজধানী যে কোনো দেশের মুখ ও মুখশ্রী। তবে অন্যান্য দেশের রাজধানীর সঙ্গে ঢাকার ফারাক হলো মুখের গড়ন যেনতেন, শ্রীর বালাই নেই! কাজেই বসবাস-অযোগ্য শহরের তালিকায় ৩ নম্বরে ঢাকার অবস্থান নিয়ে বিশ্ববাসীর বিস্ময় থাকুক না-থাকুক, ঢাকাবাসীর বিস্ময় কিন্তু অন্যখানে! হররোজ একটু একটু করে তাদের প্রাণশক্তি কেড়ে নেওয়ার জবরদস্ত বন্দোবস্তের ‘আদর্শ’ নগরী ঢাকার কবজা থেকে কীভাবে শীর্ষ স্থানটি ফসকে গেল! ১০ মিনিটের দূরত্বে দেড়-দুই ঘণ্টার দুঃসহ যাত্রার বিষয়টি এই বিস্ময়কর জিজ্ঞাসার ১০-এ ১০ নম্বর পাওয়ার একটিমাত্র উত্তর। এমন ফুল মার্কস পাওয়ার মতো আরো কিছু উত্তর মেলে ঢাকা-সংক্রান্ত আরো কিছু গবেষণা ও জরিপে।
পরিবেশ সুরক্ষায় ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স-২০১৮ অনুযায়ী ১৭৯! সালফার ডাইঅক্সাইড বা কার্বন মনোক্সাইড নির্গমনে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষে (ইউএস এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-২০১৮)। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ইপিএর ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এখানেও আলোচনায় রাজধানী ঢাকা।
কোনো রকম বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা জরিপ ছাড়াই এ কথা বলার হক ঢাকাবাসীর আছে বইকি—নগরীর চারপাশের নদীগুলো আজ আর খরস্রোতা নয়, দূষণস্রোতা। দেশের অন্য অনেক নদীকেই অবশ্য আজ আর নদী বলে চেনা প্রায় অসাধ্য। আর্সেনিক-ক্যাডমিয়াম-সিসার ভয়াবহ মণ্ডে পরিণত এসব নদীর পাড়ে দুদণ্ড দাঁড়ানো পর্যন্ত যায় না! নদীসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীরা অন্তত সাক্ষী, সবার অবহেলায় নদীগুলো কীভাবে ‘পয়োনালা’য় রূপান্তরিত।
বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকায় সিসাদূষণের শিকার কমবেশি ৬ লাখ মানুষ। আন্তর্জাতিক এক জরিপে ঢাকা পৃথিবীর সপ্তম বিপজ্জনক শহর। দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ডেঞ্জারাস মেগাসিটিস ফর উইমেন, ২০১৭ (থম্পসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন) বলছে, যৌন সহিংসতায় গোটা বিশ্বে ঢাকার অবস্থান চতুর্থ। সর্বশেষ একটি সমীক্ষায় (গ্লোবাল ডেটাবেস, নাম্বিও) ঢাকা যানজটে জগেসরা!
অর্থাত্ মানুষের কর্মক্ষমতা, উদ্যম, জীবনীশক্তি শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা ঢাকায় পাক্কা। সময় নষ্ট, অর্থের অপচয় তো আছেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম-জটে গাড়ির জ্বালানি পুড়ে বারোটা বাজছে পরিবেশের। অকারণ হর্ন বাজানোয় ঢাকার চালকদের প্রবণতা অনেকটা গণহিস্টিরিয়া পর্যায়ে চলে গেছে।
‘নাগরিক নিরাপত্তা’ সূচকে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। বলাই বাহুল্য, আলাদা করে রাজধানীতে নিরাপত্তা বেশি, এ কথা দুই ভাগে বিভক্ত ঢাকার দুই নগরপিতাও বোধকরি দাবি করবেন না। এরপর ইআইইউ-এর ‘নিরাপদ শহর সূচক-২০১৯’ অনুযায়ী ঢাকার অবস্থানের কথা বলা না-বলা সমান কথাই। ৬০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান এখানেও তলানিতে, ৫৬তম। ডিজিটাল নিরাপত্তা (উদাহরণ, সাম্প্রতিক এটিএম জালিয়াতি), স্বাস্থ্য নিরাপত্তা (ডেঙ্গুর প্রকোপ), অবকাঠামো নিরাপত্তা (চকবাজার, এফ আর টাওয়ার) ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা (রাজপথের নৈরাজ্য) এই চার ক্যাটাগরিতে তৈরি এই সূচকের বিরোধিতা করবেন কোন মুখে!
অবকাঠামোগত ঝুঁকি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই, খোলা চোখে শহরটার দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী কদিন আগেই বললেন, ঢাকার ৬৫ ভাগ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে ওঠা এসব ভবনের এলোমেলো সারি নগরীর মুখশ্রী পুরোটাই হাপিস করেছে।
নগরপিতাদের জবানিতে বরং ঢাকার বর্ণনায় আসতে পারে : রাস্তা-ফুটপাত দখল করে দোকানপাট-ব্যবসায়-রাজনৈতিক কার্যালয়, আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, শোওয়ার ঘরের সঙ্গে লাগোয়া কারখানা, মাথার ওপরে রাসায়নিকের গুদাম, ওপরতলায় গার্মেন্টস, নিচে হোটেল-মনিহারি দোকান আর মাঝের তলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক...যা খুশি তা-ই করার এমন ‘ইচ্ছে-স্বাধীন’ শহর কোথায় খুঁজে পাবে নাকো তুমি!
তবে এ কথাও ঠিক, ভিয়েনা কিংবা অস্ট্রিয়ার মতো নগরে ঢাকার ১০ ভাগের এক ভাগ মানুষও থাকে না। আর প্রতিনিয়ত কাজের সন্ধানে ঢাকামুখী মানুষের চাপও অত্যধিক। এসব সত্য মাথায় রেখেও এ কথা বলাও জায়েজ, প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও কোনো ব্যবস্থাই পুরোপুরি কার্যকর নয়, এবং কর্তৃপক্ষও ঠিক ততটাই নির্দায়।
পরাক্রমশালী ব্যবসায়ী, বেপরোয়া যানচালক, ক্ষমতাবান দখলদার, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো, ঢাকার দুর্দশার কথা সবারই জানা। এই দুর্দশা থেকে কবে উত্তরণ ঘটবে, সেটাই কেবল অজানা।
n লেখক :সাংবাদিক
