জয়নুল আবেদীন স্বপন
গ্রামটি বিচ্ছিন্ন হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। লাল মাটির টিলায় টিলায় ভাওয়ালের গজারি বনে গ্রামের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাশ ঢেকে আছে। অন্য পাশে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে শালদহ নদী। পাশেই বিল। বর্ষায় বিল জুড়ে সাদা শাপলার মনোরম দৃশ্য দেখে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। তখন চারপাশের মানুষ বিলের মনোরম দৃশ্য উপভোগের জন্য নৌকাযোগে ছুটে আসে। শালদহ নদীর মাছের স্বাদ বেশি হওয়ায় এর চাহিদা বেশি। কিন্তু চৈত্র মাসে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না। নিরিবিলি পরিবেশ এবং কোলাহলহীন ছায়াঘেরা গ্রামে মাটির ঘরের আশেপাশে লতায়পাতায় জড়াজড়ি করে মাথা উঁচিয়ে ঝোপঝাড় থেকে হাতছানি দেয় বুনোফুল। বিচ্ছিন্ন এই গ্রামটির নাম ভেরামতলী। গাজীপুর জেলায় শ্রীপুর উপজেলাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের পশ্চিম দিক ঘেঁষা সুজলা সুফলা গ্রামটি। গ্রামের দক্ষিণের সীমানা ঘেঁষে শালদহ নদীতে মিশেছে একটি ছোট খাল। নাম আম্বুরিয়া। গজারি বন ঘেঁষা গাছের ছায়ায় খালটিকে অপরূপ দেখায়। খালটি অনাব্য হলেও বর্ষার জলে নতুন রূপ ধারণ করে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, ‘এমন সুন্দর গ্রাম আর একটিও নাই।’ তাঁর অনেক নাটক ও ছবির স্যুটিং হয়েছে এখানে।
ভেড়ায় কয়, ‘ভে’ হিন্দুরা কয়, ‘রাম’ নদীর আছে ‘তলী’। সংক্ষেপে ভেরামতলী। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে শালদহ নদী ও আম্বুরিয়া খাল মিলিত হয়ে শ্রীপুর, গাজীপুর সদর ও কালিয়াকৈর তিনটি উপজেলাকে পৃথক করেছে। জায়গাটি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। গ্রামের তিন পাশে বন, একপাশে নদী, বিল ও খাল হওয়ায় ভেরামতলী গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের দূরত্ব দুই কিলোমিটার। বিচ্ছিন্ন এই গ্রামের ওপর দিয়ে মাওনা ও ভাওয়াল মির্জাপুর যাওয়ার জন্য একটিমাত্র সরু রাস্তা। যে রাস্তা দিয়ে বড় ট্রাক ও বাস ঢোকে না। সরু কাঁচা রাস্তাটি দীর্ঘদিন পর পাকা হওয়ার জন্য কাজ প্রায় শেষ হলেও অজানা কারণে মাত্র দুই কিলোমিটার রাস্তার মাটি কাটার পর ছয় মাস ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টির পানি আটকে লাল এঁটেল মাটির কঠিন কাদা পেরিয়ে কোনো গাড়ি এ গ্রামে আসতে পারে না। ছয় মাস ধরে গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এলাকাবাসীর দুর্ভোগ এখন চরমে। এ গ্রামে কোনো ইউপি মেম্বার নেই। অন্য গ্রামের মেম্বাররা ভেরামতলী নিয়ে মাথা ঘামান না। যদিও নির্বাচনের সময় এই গ্রামের মানুষের কদর বাড়ে। চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীরা ভোট পেতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে সেসব মনে রাখেন না। বর্ষা মৌসুমে নৌকাই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। শালদহ নদীও মরে যাচ্ছে—চলছে দখল ও ভরাট করার প্রতিযোগিতা।
এ গ্রামের সমাজসেবক মোসলেম উদ্দিন মাদবর ১৯৩৮ সালে নিজের জায়গায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বিদ্যালয়টি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গ্রামে যাঁরা শিক্ষিত হন তাঁরাই চাকরি নিয়ে শহরে চলে যান। একবার গ্রাম ছাড়লে আর আসতে চান না। গ্রামের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে চিন্তাও করেন না। যার ফলে বিচ্ছিন্ন গ্রামটির কান্না আর থামে না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ভেরামতলীর প্রতি আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য প্রশস্ত পাকা সড়ক প্রয়োজন। সেইসঙ্গে শালদহ নদীর ওপর নির্মাণ করতে হবে সেতু। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ভেরামতলী গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া দেখতে চাই।
গাজীপুর
