জাতিসংঘে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় হুমকি রোহিঙ্গা সংকট

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:১৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের এখনই সমাধান না হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।’ এ কারণে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ সৃষ্টির জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। পাশাপাশি এ সংকট নিরসনে চার দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন নাইজেরিয়ার তিজানি মুহাম্মদ-বান্দে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হওয়ায় আজ এই মহান সভায় এ বিষয়টি আমাকে পুনরায় উত্থাপন করতে হচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বশান্তির     লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা, নিরাপদ অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের মোকাবিলা এবং ব্লু-ইকোনমি নিয়েও আলোচনা করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা জনস্রোত যখন নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে তার এক মাসের মাথায় এই জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমার সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় গত বছর জাতিসংঘ অধিবেশনে হতাশা প্রকাশ করে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়েছিল তাকে।

ভাষণে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব, এই সমস্যার অনিশ্চয়তার বিষয়টি যেন সকলে অনুধাবন করেন। এই সমস্যা এখন আর বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিষয়টি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু ক্রমবর্ধমান স্থান সংকট এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে এই এলাকার পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।’

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সম্মানের সঙ্গে স্বেচ্ছায় রাখাইনে নিজ গৃহে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান এবং তা মিয়ানমারকেই করতে হবে বলে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি সমস্যার বোঝা বহন করে চলেছি যা মিয়ানমারের তৈরি। তাদের নিজেদেরই এর সমাধান করতে হবে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও তার বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। দুই দফায় প্রত্যাবাসন শুরুর দিনক্ষণ ঠিক হলেও তা পিছিয়ে যায়, এখনো সেখানে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের অনীহায়।’

চার দফা প্রস্তাব :রোহিঙ্গাদের স্ব-ভূমে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে জাতিসংঘে চারটি প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো : এক. রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন এবং আত্মীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে। দুই. বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের আয়োজন করতে হবে। তিন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হতে বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। চার. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণসমূহ বিবেচনায় আনতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

আরো যা বলেন : প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা, জাতিসংঘে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশন, এসডিজি বাস্তবায়ন, বাংলাদেশের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামরত ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বাংলাদেশের সুদৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী জোগানদাতা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী মোতায়েনে জাতিসংঘের আহ্বানে নিয়মিত সাড়া দিয়ে আসছে বলেও উল্লেখ করেন।

 বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতে মানুষের মনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে এসেছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি সামলে নেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অর্থ-প্রযুক্তিগত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।’

বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করলেও পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রতি অঙ্গীকার মূলত পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানেরই বলিষ্ঠ প্রতিফলন।’

প্রযুক্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে মানবসম্পদে ব্যাপক বিনিয়োগ করার কথা বলেন শেখ হাসিনা। অধিবেশনের সভাপতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানসম্মত শিক্ষা, জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপ এবং অন্তর্ভুক্তির জন্য মাল্টিলেটারিজম বা বহুপাক্ষিকতাকে উজ্জীবিত করার যে আহ্বান আপনি করেছেন তা খুবই প্রাসঙ্গিক।’