চার মহাসড়কে টোল আদায় শিগিগর

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:৩১

দেশের চার মহাসড়কে টোল আদায়ের সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলছে। এগুলো হলো : ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক। ধাপে ধাপে দেশের সকল ছয় লেন ও আট লেনের মহাসড়কেও টোল বসবে। ইতিমধ্যেই সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। তারা মহাসড়কগুলোর কোন কোন জায়গায়, কয় ধাপে, কী পরিমাণ টোল আদায় করা হবে, সেসব বিষয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

বর্তমানে দেশের তিনটি সড়কে টোল দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন যানবাহনকে চলতে হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে : নলকা-হাটিকুমরুল-বনপাড়ার ৫০ কিলোমিটার, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর-শেরপুর অংশে (রুস্তমপুর টোল প্লাজা) পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম পোর্ট অ্যাকসেস রোডের ১২ কিলোমিটার। মহাসড়কে টোল আরোপের ক্ষেত্রে এই তিনটি সড়কের টোল হার বিবেচনায় রাখা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টোল থেকে আদায়কৃত অর্থ সড়ক-মহাসড়কের সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হবে। উদ্বৃত্ত অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কল্যাণসাধন করা হবে। টোলের জমা হবে আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

পরিবহন মালিকরা বলছেন, মহাসড়কে টোল আদায় শুরু হলে পরিবহন ভাড়া বাড়বে। টোলের টাকা তো আমরা দিব না, সেটা দিবে ব্যবহারকারী জনগণ। আর সড়ক ও পরিবহন গবেষকরা বলছেন, আমাদের মহাসড়কগুলো তো টোল আদায়ের জন্য উপযুক্তই না। কারণ যেসব মহাসড়কে টোল তোলা হয় সেখানে যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হতে হয়। যেসব মহাসড়কে টোল তোলা হয় সেখানে পাশাপাশি দুই স্তরের রাস্তা থাকতে হয়। আমাদের দেশে সেটা নেই ফলে ভোগান্তি বাড়বে।এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বিদেশে আমরা যেটা দেখেছি, সেকশন সেকশন হয়। ধরুন, ২০০ মাইল রাস্তা। প্রত্যেক ৫০ মাইল রাস্তায় একটা গেট থাকে। স্থানীয় গাড়িগুলো ১০ মাইল গিয়ে আরেক রাস্তায় গেলে টোল আসবে না। লং ডিসট্যান্স ট্রাভেলারদের (দূরবর্তী যানবাহন) জন্য এটি হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কাজ করছেন দেশের প্রকৌশলীরা। এখানে অযৌক্তিক কিছু হবে না।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে তিনটি সড়কে টোল দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। সেসব সড়কের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন সড়কে টোল আদায় কার্যক্রম চালু করা হবে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর আমরা কাজ শুরু করেছি। খুব অল্পসময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়িত হবে। ইতিমধ্যেই সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি কাজ শুরু করেছেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান জানিয়েছেন, টোল আদায়ের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে। টোলের হার নির্ধারণসহ কয়েকটি বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর কার্যকর করা হবে।

এদিকে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, সারাবিশ্বেই সরকার জনগণকে সড়কে কিছু সুবিধা দিয়ে থাকে। কোনো সড়কে টোল নেওয়া হলে, কেউ যদি টোল না দিয়ে যেতে চান তার জন্য বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সারাবিশ্বেই এটা আছে। আমেরিকাতে ২১ সড়কে টোল তোলা হয়, মালয়েশিয়ায় ৩৭ সড়কে টোল নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানে কেউ টোল না দিতে চাইলে তাদের জন্য বিকল্প সড়কও আছে। যারা উন্নত সড়কটি ব্যবহার করবেন, তারা বিশেষ সুবিধা পাবেন এই কারণে টোলও দেবেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশের মহাসড়কগুলোর সঙ্গে অসংখ্য সংযোগ সড়ক রয়েছে। এখন আপনি কত জায়গা থেকে টোল তুলবেন? যেমন ধরেন ঢাকা-মাওয়া সড়ক যেটা হচ্ছে, সেখানে টোল তোলা সম্ভব। এখানে একটি প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত মহাসড়ক হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের যাতায়াতের জন্য বিকল্প একটি সড়কও আছে। আমাদের মহাসড়কগুলো তো টোল আদায়ের জন্য উপযুক্তই না।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এমনিতেই মহাসড়কগুলোতে যানজটের কারণে গাড়ি ঠিকমতো চলতে পারে না। এর মধ্যে টোলঘর বসালে প্রতিবন্ধকতা আরো বাড়বে, যানজটের পরিমাণও বেড়ে যাবে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, মহাসড়কে টোল দিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে সড়কের মান বাড়াতে হবে। স্বাচ্ছন্দ্যে গাড়ি চলার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, আমাদের এখন যে সড়ক তাতে এমনি গাড়ি চলে না, তারপর টোলঘর বসানো হলে গাড়ির গতি আরো কমে যাবে। আর্থিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। যাত্রীভাড়া বাড়াতে হবে।

এদিকে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২৬ জুন টোল নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের টোল ৪০০ টাকা, জাতীয় মহাসড়কের ৩০০ টাকা, আঞ্চলিক ২০০ টাকা, জেলা সড়ক ১০০ টাকা নির্ধারণ করা আছে। বাংলাদেশ সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের ২০১৮ সালের হিসাবে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ৩২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বলছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ২৫ হাজার ১২৯টি যানবাহন এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার ২৩৫টি যানবাহন চলাচল করে।

মেঘনা ও গোমতী সেতুর টোল আদায় করে কম্পিউটার সিস্টেম লিমিটেডের ম্যানেজার জিয়াউল আহসান জানান, দুই সেতুতে প্রতিদিন গড়ে ৩২ থেকে ৩৩ হাজার যানবাহন দুই দিক মিলিয়ে পার হয়। প্রতিদিন এই দুই সেতু থেকে ৯৫ থেকে ৯৭ লাখ টাকা টোল উঠে। এই সেতুতে ৬৫ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত টোল আছে। চট্টগ্রাম যেতে হলে এই সেতু দুটি ব্যবহার করতে হয়।