শফিকুর রহমান রয়েল
বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই; গোটা ভুটানে মাত্র চারজন মনোচিকিত্সক। তাদের একজন আবার টানা পঁচিশ বছর সেবা দেয়ার পর অতি সম্প্রতি অবসরে গিয়েছেন। বয়স ৬০ হয়ে গেছে বলে চেঞ্চো দর্জি’র সামনে এ ছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না। সেজন্যই হয়তো সরকারি চাকরি জীবনের অন্তিম দিনটিতে তিনি কাঁপছিলেন। বিদায়ী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিড়বিড় করে বলছিলেন, অনেক কিছুই করে যেতে পারলাম না আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে। সবকিছু দেখেশুনে ও বোঝার পর দেয়ালে মাথা ঠোকা ছাড়া আর কিইবা করতে পারতাম আমি।
মাদক সংশ্লিষ্টতার কারণে বর্ধিষ্ণু মানসিক সমস্যা ভুটানে এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, চেঞ্চো দর্জি এখনো মানুষের উপকারে আসতে পারবেন ভেবে নিজ পেশা থেকে একেবারেই সরে দাঁড়াচ্ছেন না। এরই মধ্যে নিজেকে বিভিন্ন সচেতনতা কর্মসূচিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। উপরন্তু তিনি উদগ্রীব হয়ে আছেন, যারা মাদকের আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে চান, তাদের জন্য একটি আদর্শ পুনর্বাসন কেন্দ্র খোলার অপেক্ষায়।
মোট জাতীয় সুখের উন্নয়ন দর্শনের জন্য ভুটান সুপরিচিত। জিডিপির অঙ্কের বদলে মানুষের ভালো থাকা না থাকাকে তারা প্রাধান্য দেয়। টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সত্ত্বেও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে ভুটানিরা রীতিমতো সংগ্রাম করছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আধুনিকীকরণের পথ অমসৃণ হয়ে উঠছে সামাজিক চ্যুতি, সীমিত অর্থনৈতিক সুবিধাদি অ্যালকোহল ও অন্যান্য মাদকের সহজ লভ্যতার কারণে। যেসবের ফলশ্রুতিতেই অস্বাভাবিক হারেও বেড়ে গেছে মাদকাসক্তির সমস্যা। দর্জি আরও মনে করেন, সমস্যা মোকাবেলায় প্রতিশ্রতির ঘাটতি ও জনগণের সীমিত জ্ঞান ভুটানের চলমান মাদক সমস্যাকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
মাদকাসক্তি ভুটানের সর্ববৃহত্ ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি রিপোর্ট বলছে, হাসপাতালে শতকরা ৫০ শতাংশ রোগীর মৃত্যুর জন্য এটিই দায়ী। আরো ভয়াবহ তথ্য হলো— দেশের ৭০ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনাই মাদকাসক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে তিনটি দেশে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার হার বেশি, মাত্র ৮ লাখ জনসংখ্যার ভুটান সে তালিকায় আছে। আর এসব তথ্য জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মাদকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি বাড়ছে ভুটানের তরুণদের মধ্যে। ২০১৭ সালে সম্পন্ন হওয়া এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এমন ছাত্রছাত্রীদের ওপর এক জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশই তাদের ৭০ শতাংশ পকেটমানিই ব্যয় করা হচ্ছে মদ, মাদক ও অন্যান্য উদ্দীপক কেনার পেছনে। অতিরিক্ত মাদক গ্রহণ করা রোগীরাই হাসপাতালের বেশিরভাগ বেড সবসময় দখলে রাখে। এদেরকে তাড়িয়েও দেওয়া যায় না মানবতার খাতিরে। ২০১৭ সালে থিম্পুতে মাদকের ব্যবহার ও বেচাকেনার অভিযোগে মাঝেমধ্যেই লোক আটক করা হলেও এ ব্যাপারে পুরো দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। আরো অবাক করে দেওয়ার মতো তথ্য হলো—ভুটানে ১০ শতাংশ মারিজুয়ানা ব্যবহার করছে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরেরা। ডাব্লিউএইচও’র তথ্য মোতাবেক, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে এই হারই সর্বোচ্চ।
ভুটানিরা স্বীকার করে মাদকাসক্তি ও অত্যাধিক মাত্রায় মাদক নির্ভরতা তাদের দেশের মূল সমস্যাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই আলাপ করলে জানা যাবে যে, তাদের নিকটাত্মীয় কিংবা বন্ধু মারা গেছে মাদক নির্ভরতার কারণে। কিন্তু বেশি জোরাজুরি না করলে এসব কথা তারা অন্য কাউকে জানাতে চায় না লোকলজ্জার ভয়ে। মিডিয়ার কারো সঙ্গে কথা বললে খুব বেশি চাপাচাপি করে নিজের নামটি উহ্য রাখতে বা প্রয়োজনে ভিন্ন নাম ব্যবহার করতে।
আসলে ভুটান শেষ সাংগ্রী-লা হিসেবে দেশের পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ ইমেজ ধরে রাখতে চায়। সেজন্য সরকার জেনেশুনেও অনেক কিছু গোপন করে। মদ্যপান ও মাদকসেবন বস্তুত তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ বনে গেছে। যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানেই জমজমাট মদের আসর। মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবনের দায়ে টগবগে যুবক কেসাংয়ের ভাই মাত্র ১৮ বছর বয়সে চলে যায় পরপারে। তার মতো অনেকেরই দাবি, সরকার যেন মদ ও মাদকের বিরুদ্ধে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সব স্বাস্থ্যকর্মী, সুশীল সমাজের সংগঠনসমূহ ও আমজনতা কেসাংয়ের মতোই একই মত পোষণ করে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য ও উদ্দীপক অপব্যবহার রোধ কর্মসূচির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওসব মানতে নারাজ। তার বক্তব্য হচ্ছে, যা কিছু করা সম্ভব, সরকার তার সবকিছুই করছে।
প্রকৃতপক্ষে সুখের নেশায় বিভোর ভুটান। জাতীয় সুখনীতির দর্শন বলতে গেলে কোনো কাজেই দিচ্ছে না। নইলে ২০১৯ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে ১৫৬টি দেশের মধ্যে তাদের স্থান হবে কেন ৯৫ নম্বরে। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি তারা মদ ও অন্যান্য মাদক সামগ্রীর মধ্যেই সুখ খুঁজে পেয়েছে?
