দুই দফা প্রস্তুতি ও উদ্যোগের পরও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। মিয়ানমারের রাখাইনে নিরাপত্তার অভাব ও উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে রাজি হয়নি। এ অবস্থায় রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও চলাফেরার স্বাধীনতা এবং সামগ্রিকভাবে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু দেশটি বলছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে করা দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তির বাইরে তারা কিছু করবে না। রাখাইনে একটি ‘সেফ জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল গঠনের প্রস্তাবও নাকচ করে দিয়েছে তারা।
মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বারবার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তারা স্বেচ্ছায়, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এজন্য মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন মিয়ানমারকে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে তাগিদ দিয়ে আসছে। চলমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ।
গত শুক্রবার (যুক্তরাষ্ট্রের সময়) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দায় সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের। তাদেরই এর সমাধান করতে হবে। তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চারটি প্রস্তাব দেন। এগুলো হলো—টেকসই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে। বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের আয়োজন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হতে বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণসমূহ বিবেচনায় আনতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ অধিবেশনে এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন, যার মধ্যে রাখাইন রাজ্যে আলাদা ‘বেসামরিক পর্যবেক্ষক সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠাসহ কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা ছিল।
শেখ হাসিনার ভাষণের এক দিন পর যুক্তরাষ্ট্র সময় শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর কার্যালয়ের ইউনিয়ন মন্ত্রী কিয়াও তিন্ত সোয়ে। ওই ভাষণে তিনি বলেন, নতুন শর্ত দিলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে করা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাইরে যাবে না তার দেশ। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, নির্বিঘ্ন এবং সফল প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগের পাশাপাশি এ বিষয়ে সই করা চুক্তির শর্তও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সই করেছে, সেই চুক্তি অনুযায়ীই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আগ্রহী। এই চুক্তির যথাযথ প্রয়োগই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের একমাত্র উপায় বলেও জানান তিনি। আর তাই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কঠোরভাবে মেনে চলতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো শর্ত বা উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে বলেও সতর্ক করে দেন তিনি।
সোয়ে বলেন, মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্রমাগত আহ্বান রয়েছে। মিয়ানমারের ভেতরে সেফ জোন বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরির চাপও রয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না এবং এটি বাস্তবসম্মতও নয়। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের মুখে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য ‘আরো উপযোগী পরিবেশ’ তৈরিতে মিয়ানমার অগ্রাধিকার দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী, প্রত্যাবাসনে যোগ্যদেরকে পরিচয়পত্র বা আইডেন্টিটি কার্ড দেওয়া হবে এবং মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী যোগ্যদের নাগরিকত্ব কার্ড দেওয়া হবে। বাকিরা ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড বা এনভিসির আওতাভুক্ত হবে। এ বিষয়ে সোয়ে বলেন, এই কার্ড জাতিসংঘের অনুমোদিত অভিবাসীদের জন্য দেওয়া গ্রিন কার্ডের মতো হবে। কক্সবাজারের শিবির থেকে মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহীদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে কয়েকটি পুলিশ চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের ওপর পরিকল্পিত নিধন অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মুখে সামরিক অভিযানের সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। আগে-পরে মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘ একে জাতিগত নির্মূল কর্মকাণ্ডের ‘টেক্সটবুক’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে নিজেদের বাহিনীর হাতে বড়ো মাত্রায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নাকচ করেছে মিয়ানমার।
পরে বিভিন্ন দেশ, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার রাজি হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে। কিন্তু দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিয়েও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। মূলত নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হয়নি। সেই সঙ্গে নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবিও তুলেছে রোহিঙ্গারা। একই সঙ্গে রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে আহ্বান জানিয়েছে তারা। অন্যদিকে টেকসই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়ে আসছে।
