লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মেঘনা নদীর ভাঙন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অতিসম্প্রতি ভাঙন আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহের ব্যাবধানে উপজেলার চরফলকনের লুধুয়া এলাকায় নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে মসজিদ কমিউনিটি হেলথ সেন্টার ও প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারসহ মোট চারটি ভবন। একই চিত্র উপজেলার নদীতীর ঘেঁষা প্রায় ১৫ কিলোমিটার জুড়ে। ফলে আতংকে দিন পার করছে পুরো কমলনগরবাসী।
অধিক ভাঙন কবলিত চরকালকিনি, সাহেবেরহাট, চরফলকন, পাটওয়ারীর হাট ও চরমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, গত ৮/১০ বছরের ব্যবধানে নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে ১৬টি ইউপি ওয়ার্ড অফিস, ১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১০টি সাইক্লোন শেল্টার, ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৪টি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসা, ১০টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ২টি আশ্রায়ণ প্রকল্প, ছোট বড় মিলিয়ে ৬টি বাজার, ১টি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও ১টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস, এছাড়া নদীর গহীনে হারিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রাম জনপদ বাস্তুভিটা সহ ব্যাপক ফসলী জমি।
মেঘনার মোহনায় অবস্থিত কমলনগর। উজান থেকে নেমে আসা মোট ৫৬টি নদী, অর্থাৎ ভারত থেকে ৫৪টি, সিকিম থেকে একটি এবং নেপাল থেকে ১টি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ নদীগুলো বিভিন্ন নামে দেশব্যাপী প্রবাহিত হয়ে ভৈরব থেকে চাঁদপুর হয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর লক্ষ্মীপুর সদর কমলনগর ও রামগতি হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে।
প্রতিবছর নদী গুলো উজান থেকে বয়ে আনছে কোটি কোটি টন পলি, বালি, কাঁকর। যা জমা করছে এর মোহনায়, ফলে নদীর মূল চ্যানেল ভরাট হয়ে গেছে, নদীতে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য ডেগাচর, ডুবোচর তাই নদীর ভাঙন ক্রমশ আগ্রাসী রুপ নিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাসদ লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মিলন মন্ডল বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আমরা নদীকে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় নেওয়ার দাবি করে আসছি। যা দেশি বিদেশি নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবনা। ড্রেজিংয়ের দাবিতে আমাদের পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন দীর্ঘদিন যাবৎ মানববন্ধন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, পদযাত্র, হরতাল সহ নানামুখী কর্মসূচি করেছে। কিন্তু প্রকল্প নেওয়া হয় তীর রক্ষাবাঁধ আউটারবেঁড়ি কিংবা ব্লক বা পাথর ফেলার কর্মসূচি। যার অধিকাংশ অর্থই লোপাট হয়ে যায়, অপরদিকে নদীও শাসন হয় না।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, 'নদী ভাঙনের এমন বিধ্বংসী রূপ অতীতে কোথাও আমার নজরে পড়েনি।'
তিনি আরও বলেন, 'জিওব্যাগ দিয়ে ডাম্পিংরত অবস্থায় একটি মসজিদ মাত্র ৫০ মিনিটের মাথায় নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেলো। আমরা অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম কিছুই করার ছিল না।'
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে অধিক ভাঙন কবলিত এলাকায় আমরা আপদকালীন জরুরি মেরামতের কাজ করছি। আমরা ইতিমধ্যেই রামগতি কমলনগর তীর রক্ষা প্রকল্প ২য় পর্যায়ের ডিপিপি প্রস্তুত করেছি। অচিরেই বিবেচনার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবো। প্রকল্পে রামগতি কমলনগরের ৩১ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধের জন্য প্রাক্কলিত ব্যায় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
ড্রেজিং বিষয়ে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, 'বর্তমানে ১ কিউবিক মিটার ড্রেজিং করতে গড়ে ১৯০ টাকার প্রয়োজন। এত বিশাল মেঘনা নদী ড্রেজিংয়ের অর্থ ব্যায়ের ভার বহন করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী ১০০ বছরব্যাপী যে ডেল্টা প্ল্যান হাতে নিয়েছেন সে অনুযায়ী দেশের ছোটনদী ও খালসমূহ খনন চলছে। দেশের সমস্ত নদী-খাল খননের পর ডাউনের মুখ খোলা হবে। মেঘনাকে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় তখনই নেওয়া হবে।'
আরও পড়ুন: মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উদযাপন
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অবঃ) আবদুল মান্নান বলেন, '২০১৪ সালে ১৩শ কোটি টাকা ব্যায়ে রামগতি কমলনগর মেঘনার তীর রক্ষা বাঁধ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিলো। সে মোতাবেক ২৯৮ কোটি টাকা ব্যায়ে রামগতি ৪ কিঃমিঃ এবং কমলনগর ১ কিঃমিঃ তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণও করা হয়েছিলো। যদিও নির্মণত্রুটির কারণে কমলনগর অংশের ১ কিঃমিঃ প্রায় বিলীন হওয়ার পথে, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পানি সম্পদ মন্ত্রাণালয় প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। এখন আবার ডিপিপি প্রেরণ করা হচ্ছে, আশা করি প্রধানমন্ত্রী ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় মানবিক কারণে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রামগতি কমলনগর রক্ষার মহান দায়িত্বটি পালন করবেন।'
ইত্তেফাক/নূহু

