বাঁশ। বাঁশঝাড়। বাঁশ ডলা। বাঁশ দেওয়া। বাঁশপাতুরি। বাঁশবন। বাঁশরী। বাঁশি। এ পর্যায়-শব্দ থেকে অধুনা-আলোচিত বাঁশ, বাঁশ দেওয়া, বাঁশি এই শব্দত্রয়ী আমাদের বেশ পছন্দ। উজাড় হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ আমরা এখন থেকে বৈধ ও বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারব অরণ্য নয়, জনারণ্যে, সভায়, মাঠে-ময়দানে।
একটু পেছনে ফেরা যাক। প্রকৃতি আমাদের বাঁশ দিয়েছে। সেই বাঁশ আমরা হাতে পেয়ে আমাদের জন্মে দিলাম, মরণে দিলাম। আজন্ম-আমৃত্যু দিলাম। সারাজীবন শুধু দিয়েই গেছি। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। শুরুতে মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ি কেটে দিলাম। কী পেলাম? ধাই মা ও বাঁশের ছিলকা। হাজামরা যাই বলি, আবারও সেই বাঁশের ছিলকা দিয়ে সেই শৈশবেই খাতনা। জীবনের শেষে, মৃত্যুতে। গোর দেওয়ার সময় মাটি দেওয়ার আগে আড়াআড়িভাবে টুকরো করে সেই বাঁশ দেওয়া। তার ওপরে বাঁশ দিয়ে চাটাই দেওয়া। দাফন শেষে বাঁশের ফালি দিয়ে বেড়া দেওয়া। বা শবদাহে শ্মশানে আমরা কি বাঁশের অকাতর যোগান দিইনি?
বাঁশ বড় সৃজনশীল! ক্রীড়ানৈপুণ্য। রন্ধনশৈলী। যাতায়াত। আবাস। চাষাবাদ। ব্যবসায়। রাজনৈতিক গল্প। কোথায় না বাঁশ নেই? কথায় বাঁশ, কাজে বাঁশ। কতোভাবেই তো দেওয়া হয়। এককালে লিখতে গেলেই তো দরকার হতো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কালিতে ডোবানো কলম। বাঁশি চাই? ঐ তো বাঁশিওয়ালা, হাতে বাঁশের বাঁশি। কৈশোরে মনের সুখে নাটাই হাতে মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি রঙিন ঘুড়ি উড়িয়েছি। আবহমানকাল থেকে কুটির শিল্প-লোকশিল্পে বাঁশের তৈরি হস্তশিল্প আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে দুর্গম বনাঞ্চলের বাঁশই কর্ণফুলী কাগজ কলের মুখ্য কাঁচামাল। তাঁতশিল্প তো বাঁশ ব্যতীত উপায়হীন। বিচিত্র সম্ভার নিয়ে বৈশাখীমেলায়, হাটে-মাঠে-বাটে—কুলা, ডুলা, ঝাঁঝরি, চালুনিসহ বিভিন্ন কৃষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী জিনিস কাছে গিয়ে হাতে নিয়ে দেখুন—বাঁশের কী বাহারি ব্যবহার! এমনকি নির্মাণকলায় লৌহদ্রব্যের বদলে বংশদণ্ড ব্যবহারে আমরা উদগ্রীব ও সাহসী হয়েছি।
সেই সুদূর আরণ্যক জীবন থেকে গ্রামীণ জনপদে আত্মরক্ষার্থে কী ঝগড়াঝাঁটি কী মারামারিতে, বাঁশের লাঠি ফাটাফাটি। গরুর গাড়ি, ঠেলা গাড়ি ও নৌকোর মাচা ছিল বাঁশের। নৌকোর তো দাঁড় বা লগি, বৈঠা, মাস্তুল, পাটাতন, ছই—সবই বাঁশ দিয়ে তৈরি করা যায়। অনাদিকাল থেকে হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের হাত থেকে রেহাই পেতে ভূমি থেকে নিরাপদ উঁচুতে বুনো পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী করে গৃহকৌশল নির্মাণের আদিবাসী মাচাং-টংঘর তৈরি হয় বাঁশ দিয়েই। সমতলেও ঘরবাড়িগুলি বাঁশ ও বাঁশের খুঁটিতে। বাঁশের বাখারি দিয়ে চাল, বেড়ায় তার বাঁশ। কৃষিকাজে রোদ-বৃষ্টিতে চাষির মাথার মাথাল, মাথা থেকে একসঙ্গে পিঠ বরাবর দেহ ঢেকে দেওয়া প্রচ্ছাদন, খেতের বেড়া, মই, বলদের ঘাড়ে জোয়াল, হাতের পাঁচন, পুঁইয়ের মাচা প্রভৃতি—কোনটি বাঁশের নয়। ভাবা যায়, তিতুমীর বাঁশ দিয়ে তৈরি করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত দুঃসাহসিক দুর্গ—বাঁশের কেল্লা।
আমাদের শিল্প-সাহিত্যে কান পাতলেই বাঁশির সুর শোনা যাবে। সে কৃষ্ণের বাঁশিই হোক আর প্রেমের বাঁশিই বলি। যখন আজো শুনি—‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ’—তখন একাকার হয়ে ওঠা সেই পড়া-শোনা-দেখার কথা মনে পড়ে। সেই বেনুবন আজো একদম শূন্য নয়। মনে পড়ছে কাজী নজরুল ইসলামের বহু প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী সেই উচ্চারণ—‘মম এক হাতে মোর বাঁকা বাঁশের বাঁশরী।’ সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে তো বাঁকা করতেই হয়। আর ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’ এটা যে শুধু কথার কথা নয়।
বাঁশকে আমরা কতোটা মর্যাদা দিয়েছি? কেবলি নির্বিচারে নিষ্ঠুরের মতো নিধন করেছি। সব শেষে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কথা মনে পড়ছে। তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ‘তৈল’। আজ যদি বেঁচে থাকতেন লিখতে পারতেন: বংশ। তেল দেওয়া নিয়ে তিনি লিখেছিলেন। বাঁশ দেওয়ার বিপরীত। কিন্তু অন্তর্গত অর্থে এক। কারণ, তোষামোদও যাকে করা হয়, তার এক ধরনের সর্বনাশ। আর তেল দেওয়া ও বাঁশ দেওয়া যদি একসঙ্গে ঘটে? আচ্ছা, তার ওপরে যদি একটি বানরকে চড়িয়ে দেওয়া হয়? কেন, সে ওপরের দিকে যতটা না উঠবে তার চেয়ে আবার পিছলে পড়ে, এভাবে বারবার ওঠানামা করবে! বাঁদরের বাঁদরামির দিকে নাইবা তাকালাম।
আপাতত আমাদের বাঁশটিও সেরকম নয়। তবে, ঐ বাঁশ এবং এই বাঁশ চাঁচাছোলা না আ-চাঁচাছোলা দেওয়া হয়েছিল, তা জানি না!
