বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০১৯, ২১:০৯

আবদুল মান্নান

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আজ, অক্টোবরের ৩ তারিখে, নতুন দিল্লি যাওয়ার কথা রয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গিয়েছিলেন ২০১৮ সালের মে মাসে বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন ও আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত আসানসোলে অবস্থিত কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক তাকে দেওয়া সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণ করতে। সেই সফরটি কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না, তবে সে সফরের সময়ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এর আগে ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করেন। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফিরতি নতুন দিল্লি সফর করেন। দুই দেশের মধ্যে এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফরকে ঘিরে উভয় দেশেই নানা বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত হয়। এই ধরনের সফরকে গণমাধ্যম বেশ গুরুত্ব দেয় এবং ফলাও করে প্রচার করে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর থেকেই যে কটি সফর প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে উভয় দেশের মধ্যে সেই দেশ বিভাগের পর থেকে অমীমাংসিত বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে। এর আগে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করলে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন দেবগৌড় আর চুক্তিতে উপনীত হতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, যিনি আজীবন বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে আরেকটি অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায় আছে, সেটি তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি। এই চুক্তি না হওয়ার পেছনে একটিমাত্র কারণ আর তা হচ্ছে এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনড় অবস্থান। তার ধারণা, এই চুক্তি হলে পশ্চিমবঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০১১ সালে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ঢাকা সফরের সময় মনে করা হয়েছিল সেই সফরের সময় তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি অবশ্যই হবে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ঢাকা আসবেন। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সফল হবে, আশাবাদটা এমনই ছিল যে ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি মিডিয়াতে ঘোষণা করেছিলেন তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এবার হচ্ছে। সবাইকে হতাশ করে সেবার ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ঢাকা আসেননি। এবারও তিনি শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় সেখানে উপস্থিত থাকবেন না। এবার তিনি অজুহাত দিয়েছেন শারদীয় দুর্গোত্সবের।

এটি স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করলে উভয় পক্ষই লাভবান হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যেমনটি হওয়া উচিত ছিল ঠিক তেমনটি নয় বহুদিন ধরে। এর কারণ নানাবিধ। পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যুদ্ধংদেহি সম্পর্ক সেই দেশভাগের পর থেকে। ইতিমধ্যে দুই দেশ চারবার যুদ্ধ করেছে। নেপালের সঙ্গে সম্পর্কটা সময় সময় ওঠানামা করে। ২০১৫ সালে ভারতের অঘোষিত ব্লকেডের কারণে নেপালে বেশ কিছু দিন ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চরম ঘাটতি দেখা দেয় এবং দেশটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটাও ওঠানামা করে। চীন আর ভারতের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছে। শ্রীলঙ্কা অবস্থানগত কারণেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে চীনের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। ভুটান একটি ছোটো রাষ্ট্র। তার সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক আছে বটে কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভুটানের সঙ্গে চীনেরও সুসম্পর্ক আছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের ছোটো এক টুকরা সীমান্ত আছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সব সময় চেষ্টা করেছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে, কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। ভারত আমাদের ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ৯ মাস নৈতিকভাবে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে সহায়তা করেছে। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী দেশে দেশে ঘুরে বাংলাদেশের জন্য সমর্থন আদায় করেছেন। বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করতে একাত্তরের তেসরা ডিসেম্বর চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। প্রায় ৬ হাজার ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করতে নিজের জীবন দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্কে দ্রুত চির ধরতে থাকে। তার উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল যে বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে ভারতের এত অবদান ও ত্যাগ, যে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করে। তবে শেখ হাসিনা যখনই সরকার গঠন করেছেন, তখনই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। একটি দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার চেয়ে মূল্যবান আর কিছু হতে পারে না।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতকে দেওয়া নৌপথে ট্রানজিটের পরিধি বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশের মতো একটি ছোটো দেশও যে ভারতের মতো একটি বড়ো দেশের জন্য কতটুকু সহায়ক হতে পারে, তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের পাশের ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরাকে আশুগঞ্জ নদীবন্দর ব্যবহার করে তার তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বড়ো আকৃতির যন্ত্রপাতি পরিবহনের ব্যবস্থা করে দেওয়া। ইতোমধ্যে ভারতকে বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। রেলপথে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা আগে থেকেই দেওয়া আছে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং পদ্মা সেতু চালু হলে তারও সুবিধা ভারত পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়, যা আরো বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সম্প্রতি বলেছেন, ভারত প্রতিবছর ১৫ লাখ বাংলাদেশিকে ভিসা দিয়ে থাকে। এই ১৫ লাখ মানুষ বছরে একবারও (বাস্তবে আরো বেশি) যদি ভারতে ভ্রমণ করে এবং সেখানে গড়ে ৫০০ ডলার খরচ করে, তার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ৬ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা (৮৫ টাকা ডলার হিসাবে)। কলকাতা, চেন্নাই, মুম্বাই, ভেলোর, বেঙ্গালুরু, দিল্লিসহ ভারতের বড়ো বড়ো হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীতে ঠাসা। গত বছর আমি পাঞ্জাবের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি, সেখানে ৭০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এটা একটা নমুনামাত্র।

ভারত সরকারের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড ও কিছু রাজনীতিবিদের বেসামাল উক্তি এদেশের মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তা অস্বীকার করা যাবে না। সম্প্রতি ভারতের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক বাংলাদেশে কিছুটা হলেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে এক বৈঠকে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। মোদি শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন যে বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ, তাতে বাংলাদেশের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

শেখ হাসিনার আসন্ন দিল্লি সফরের সময় বেশ কিছু সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে বিরাজমান সুসম্পর্কটা আরো শক্তিশালী হবে, যেদিন দুই দেশর তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে। এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদি ইতিপূর্বে তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এবং তিনি আন্তরিক বলে মনে হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর দুর্গোত্সবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ৫০০ টন পদ্মার ইলিশ যাচ্ছে। দুই প্রতিবেশী দেশের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হোক। লাভবান হোক উভয় দেশ। শুধু ভারতের বন্ধুরাষ্ট্রই নয়, বাংলাদেশ ভারতের জন্য কৌশলগত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

n লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক