যেমন চলছে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:৪৬

এম. এ. মাসুম

 

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স নিয়ে বর্তমানে ৩৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছে। সারা দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে ৫৩২টি। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই আর্থিক অবস্থা ভয়াবহ সংকটে নিমজ্জিত। গ্রাহকের কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের সর্বশেষ স্থিতি ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর বেশির ভাগ বিতরণ করা হয়েছে আবাসন খাতে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানত প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে, সে সঙ্গে বাড়ছে ব্যাংক থেকে নেওয়া ধার। এতে তাদের ঋণ বিতরণ ও লিজ অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার বিষয়টি সময়ে সময়ে আলোচনায় এলেও নন-ব্যাংকিং আর্থিক খাত অস্তিত্বহীন হচ্ছে অনেকটা নীরবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই এ খাতের ১২টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। এর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান নামেই বেঁচে আছে। খেলাপি ঋণ, মূলধনসংকট, প্রভিশন ঘাটতি, গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে না পারাসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর মতো আপতত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কী মানের, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছরই এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল স্টাবিলিটি রিপোর্ট নামে একটি প্রকাশনা বের করে। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন সক্ষমতা বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাল, হলুদ ও সবুজ এ তিনটি শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশনায় দেখা গেছে,  ১ থেকে ৫ পর্যন্ত অর্থাত্ ভালো থেকে খারাপ বিবেচনা করে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া হলুদ তালিকায় বা সহনীয় অবস্থায় রয়েছে ১৮টি প্রতিষ্ঠান। মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ভালো বা সবুজ তালিকায়। অর্থাত্ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাই অত্যন্ত খারাপ। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও খারাপ, খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ। আমানত ফেরত দেওয়া তো দূরের কথা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতেই পারছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

পরিচালনা সক্ষমতা না থাকায় অবশেষে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য লিকুইডেটরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমানতকারীরা আশায় আছে তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার। অন্যদিকে বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণীর তথ্য বলছে, পিপলস লিজিংয়ের যে সম্পদ আছে, দায়ের পরিমাণ তার প্রায় আড়াই গুণ। অর্থাত্ আমানতকারীদের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ পিপলস লিজিংয়ের নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে উঠে আসে, পিপলস লিজিং থেকে বিতরণ করা ঋণের অধিকাংশই জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক পরিচালকরা তুলে নিয়েছেন। ভুয়া কাগজ তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১৫ সালে পাঁচ পরিচালককে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অভিযুক্ত সাবেক আট পরিচালক ও তিন কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং সম্পত্তি বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

পিপলস লিজিং বন্ধ হলে শুধু এ খাত নয়, যেহেতু আর্থিক খাত পরিচালনা করা হয় ব্যাংকিং পদ্ধতিতে তাই পুরো ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব পড়বে। এছাড়া পুঁজিবাজারেও এর ধাক্কা লাগবে। আমানতকারীদের আস্থা কমে যাবে। যেহেতু এটাও ব্যাংকিং সিস্টেমের মতো, এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যাংকিং খাতে পড়বে।

ব্যাংকের মতো এনবিএফআইয়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ তাদের কাছে গচ্ছিত জনগণের আমানতের পরিমাণ ক্রমে বেড়ে উঠছে। তাদের কার্যক্রমে আরো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র অডিটসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। সাবেক ওরিয়েন্টাল, বেসিক ও ফারমার্স ব্যাংক থেকে শুরু করে হালের পিপলস লিজিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে যারাই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন, তাদের প্রত্যেকেরই শাস্তি প্রাপ্য। রেড জোনে থাকা এনবিএফআইগুলোকে কীভাবে গ্রিন জোনে আনা যায়, তার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।