মুদ্রার অপর পিঠটিও বিবেচনায় নিতে হবে

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:০৩

সাধারণত প্রতিটি সময়ের একটি নিজস্ব ট্রেন্ড থাকে। আর তাই কিছুদিন আগে সংবাদপত্রের যে স্থানটি জুড়ে ছিল ‘ধর্ষণ’, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে ‘আত্মহত্যা’। এযেন ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। একটি দুঃসংবাদের সঙ্গে আর একটির ক্রমবাহিকতা। মূলত, যেকোনো ধরনের মৃত্যুই শোকাবহ। আর এ চলে যাওয়া যদি হয় অসময়ে তাহলে তার ভার আরও ভয়াবহ। কিন্তু মৃত্যু যদি হয় স্বপ্রণোদিত তাহলে শোকের পাশাপাশি তা উন্মুক্ত করে অসংখ্য প্রশ্নবাণের। আর হাজার প্রশ্নের ভিড়ে যে বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না তাহলো, কেন এ আত্মহনন এবং কারা এর পেছনে প্ররোচনাকারী। মূলত, ‘আত্মহত্যা’ এমন একটি বিষয় যেখানে ব্যক্তি যুক্তির চাইতে বেশি পরিচালিত হন আবেগের দ্বারা এবং আবেগের ক্ষেত্রে বুদ্ধিলোপ পাবার দরুন নিঃসন্দেহে ‘আত্মহত্যা’ একটি বুদ্ধিনাশী ক্রিয়া।

সাধারণ একজন মানুষ চরম হতাশা থেকে আত্মহনন করে থাকেন। কারণ তিনি মনে করেন একমাত্র এর মাধ্যমেই সকল প্রতিবন্ধকতা আর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি সম্ভব। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে আত্মহত্যা হেরে যাবারই আরেক নাম। প্রবাদে বলে ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আস’ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তির সকল সম্ভাবনার পরিসমাপ্তি ঘটে। তার মধ্যে যে অপার সম্ভাবনা নিহিত ছিল, ভয়কে দূর করার যে ক্ষমতা ছিল তা আর কখনও প্রস্ফুটিত হতে পারে না। সর্বোপরি আত্মহত্যা শুধুমাত্র ব্যক্তিকেই নয় বরং পরিবার আর সমাজকেও করে প্রভাবিত। আর এজন্যই ধর্মীয় দৃষ্টিতে আত্মহত্যা পাপ, মনোবিজ্ঞানীদের মতে মানসিক বিকারগ্রস্ততা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি অগ্রহণযোগ্য কার্যকলাপ। তাই যে কারণেই হোক আত্মহত্যাকে পুঁজি করে কোনো বিষয়কে বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া যেমন অপরাধ, ঠিক তেমনি আত্মহত্যাও একটি অপরাধ, যা আমরা কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারি না।

আমরা যদি বিগত কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে আত্মহত্যা যারা করে থাকেন তাদের বেশিরভাগেরই বয়সসীমা পঁচিশের ঊর্ধ্বে নয়। সাধারণত একজন মানুষের মস্তিষ্কের বুদ্ধিতাত্ত্বিক বিকাশে সময় লাগে পঁচিশ বছর। পঁচিশের আগে মানুষ যুক্তির চাইতে আবেগ দ্বারা বেশি পরিচালিত হন। তাই এসময় সামাজিক অনুমোদন পাবার বা প্রশংসিত হবার বিষয়গুলো যদি পরিবার বা পরিচিত জনের থেকে না এসে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আসে, তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন ব্যক্তি পরিবারের সদস্য নয় বরং ভার্চুয়াল জগেক বেশি আপন মনে করবে। আর ভার্চুয়াল জগতে অন্যের হাস্যোজ্জ্বল জীবনের সঙ্গে নিজের পাওয়া না পাওয়ার তুলনামূলক পর্যালোচনা ব্যক্তির মধ্যে যে মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে তার চরম অবস্থাই আমাদের মাঝে সৃষ্টি করে হতাশা, যার চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা বেছে নেই আত্মহননের পথ। সেক্ষেত্রে আমাদের প্রশ্নবান আত্মহত্যার প্ররোচক হিসেবে শুধুমাত্র শিক্ষকদের দিকে তাক করানো কতটা যুক্তিযুক্ত? পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, সমাজে গড়ে উঠা নম্বরভিত্তিক প্রথা কি এর জন্য দায়ী নয়? আমাদের সন্তানের হাতে দামি মোবাইল ধরিয়ে দেওয়ার চাইতে তার সঙ্গে বসে কথোপকথনের মাধ্যমে তার মানসিক অবস্থা জানা কি আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না?

ভিকারুন্নেসা নূন স্কুলের ঘটনা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক কিন্তু যারা এ ঘটনার জের ধরে শিক্ষকের মৃত্যুদণ্ড দাবি করছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন হলো শিক্ষক হিসেবে আজ যদি আমরা আমাদের বাচ্চাদের শাসনের অধিকারটুকু আত্মহত্যার হুমকির কাছে হারাই তাহলে পরবর্তীকালে কোনো শিক্ষক কি আর চাকরি যাবার ভয়ে শিক্ষার্থীকে মানুষ বানাতে সচেষ্ট হবে? বলছি না যে সকল শিক্ষকের আচরণ শিক্ষকসুলভ কিন্তু তাই বলে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার হুমকি যেন পরবর্তীকালে দাবি আদায়ের মাধ্যমে পরিণত না হয় তাই বিবেচ্য। তাই আত্মহত্যাকারীকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে না দেখে আত্মহত্যাকে করতে হবে সমালোচিত। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, শিক্ষক রক্ত মাংসের মানুষ,  ভুল-ত্রুটি তারও হতে পারে। তাই অন্যায় করলে শাস্তি তার প্রাপ্য কিন্তু তাকে অপমান করে নিজের জাতিকে লাঞ্ছিত করার অধিকার কারো নেই। কারণ যে জাতি শিক্ষককে মর্যাদা দেয় না, সে জাতি অন্তত উন্নত হতে পারে না।

পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে বাড়াতে হবে যোগাযোগ, যাতে সে আপনার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং একই সঙ্গে বেশি নম্বর পাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হবে মানুষ হবার জন্য, জ্ঞান আহরণের জন্য। কারণ লক্ষ্য যদি থাকে জ্ঞান আহরণের, তাহলে সে শুধুমাত্র পরীক্ষা পাসের জন্য পড়বে না, যতটুকুই পড়বে, ভালোবেসে শিক্ষা লাভের জন্য পড়বে। তাই আমাদের সকলের উচিত একে-অন্যের বিরোধিতা না করে একসঙ্গে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের আচরণ সংশোধনের মাধ্যমে সমাজের এ রাহুগ্রস্ত অবস্থা থেকে আমাদের জাতিকে পরিশুদ্ধ করা।

n লেখক :প্রভাষক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি