সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
রাজনীতির ময়দানে জিনিসটার দেখা হারহামেশাই মেলে। উদাহরণস্বরূপই বলি তাহলে। ছোটবেলার ঘটনা। মধু দার বাবা মেম্বর ইলেকশন করছেন। মধু দা আমাদের এক পিস জিলাপির লোভ দেখিয়ে মিছিলে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও প্রথম প্রথম গেলাম কয়েকবার। কিন্তু তারপর যখন পুরো বিষয়টি বোধগম্য হলো, তখন ক্ষান্ত দিলাম। একদিন মধু দা আমাদের খুঁজতে এলেন।
‘তোরা মিছিলে কেন যাচ্ছিস না?’
‘এ-এমনিই।’
‘না, এমনিই না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।’
‘জিলাপি ভালো লাগছে না। আর পান-বিড়ি তো বড়দের খাবার।’
মধু দা হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাবেন, এমন অবস্থা।
‘যা, এরপর থেকে তোদের জন্য ক্ষিতিরপুরের বিখ্যাত রসগোল্লা বরাদ্দ থাকবে।’
ভাই ভেবেছিলেন, তার এমন প্রলোভনে আমরা বুঝি ইয়াহু বলে চিল্লিয়ে উঠব। কিন্তু, ভাইকে হতাশ করলাম আমরা। আমাদের মাঝে কোনো ভাবান্তরই দেখা গেল না।
‘সত্যি কথা বলবি? তোরা আবার অন্য কোনো মার্কাতে ভোট দেওয়ার ফন্দি করছিস না তো?’
‘তুমি কী যে বলো না, মধু দা। আমাদের কি ভোটের বয়স হয়েছে?’
‘ওহহো, তাও তো কথা। তাহলে বাবার মিছিলে যেতে সমস্যা কিসের? কেউ বারণ করেছে?’
আমরা পড়ে গেলাম গত্যান্তরে। কথাটা মধু দাকে কী করে যে বলি...। শেষমেশ বলেই ফেললাম, ‘তোমার বাবাকে সেই ছোট্টবেলা থেকে কাকু ডেকে আসছি। হঠাত্ নতুন কোনো সম্বন্ধ না হওয়ার আগে ভাই ডাকি কী করে?’
আমাদের কথা শুনে মধু দা আরেক চোট হেসে নিলেন। তার বাবা নির্বাচনে জয়লাভ করলেও মুখে এতটা হাসি থাকবে বলে সন্দেহ।
‘ওহহ, এই কথা। রাজনীতিতে এসব কোনো ব্যাপার না।’ যেন হাত দিয়ে মাছি খেদালেন তিনি।
‘কিন্তু আমাদের কাছে ব্যাপার। আমরা সেসব পারব না।’
‘তাহলে আয় রাবিদ (সম্বন্ধ) বদলে ফেলি আজ থেকে?’ মধু দা প্রস্তাব দিলেন। ‘আজ থেকে আমি তোদের মধু কাকা। কি এরপর থেকে তো বাবাকে তোরা ভাই সম্বোধন করতে পারবি, নাকি?’
‘বিলকুল পারব। কিন্তু মিছিলে তুমিও যখন বরাবরের মতো তোমার বাবাকে ‘ভাই’ বলে স্লোগান তুলবে, তখন হিসাব মিলাতে পারব না যে...’
মধু দাকে দেখে মনে হলো, তিনি অতল খাদে পড়েছেন। বোধহয় আমাদের বোঝাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। খুব।
শেষমেশ বললেন, ‘মিছিলে আমি আব্বুকে মোটেও ভাই বলে সম্বোধন করি না।’
‘ডাহা মিথ্যে কথা।’ মনে মনে বললাম। মধু দাকে তীর্যক সুরে বললাম, ‘তাহলে বাপকে কী বলে ডাকো শুনি, ইয়ার?’
‘তোরা সত্যি সত্যিই আমার স্লোগান শুনিসনি? আরে মিছিলে তো আমি সবসময়ই অন্যদের সাথে বলে আসছি, আমার আব্বা, তোমার ভাই, কদু আব্বা, কদু ভাই!’
আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
তবে সত্যি কথা বলতে কী, চক্ষু লজ্জা ভেঙে আমরা একই সঙ্গে মধু দাকে আর তার বাবাকে ভাই বলার বহুত চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুতেই মুখ থেকে ‘কদু ভাই’ কথাটি বের হতে চায়নি। আর মধু দাও আমাদেরকে তার প্রতিশ্রুতি মতো গরমাগরম রসগোল্লা খাওয়াননি। কী জন্য খাওয়াননি? সেটা অবশ্য সেসময়ে জানতে পারিনি। আমরা এই ধারণা নিয়েই বড় হয়েছি, মধু দা হয়তো আমাদের ফলো করেছিলেন, আমরা প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি বলেই হয়তো তখন রসগোল্লা কপালে জোটেনি।
অবশ্য ‘রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি’ শব্দটার সঙ্গে পরিচয় ছিল না তখন।
দুই.
‘হিরু ভাই, তোমার অপরকে ভাই ডাকা নিয়ে বিড়ম্বনার গল্প তো শুনলাম। এমন কোনো গল্প নেই যাতে অন্য কেউ তোমাকে ভাই ডেকে বসেছে! আই মিন, ধরো—তুমি কোনো মেয়েকে পছন্দ করো। সে-ই একদিন তোমাকে ভাইয়া ডেকে বসল! এমন কোনো গল্প নেই?’
তোতা চাকলাদারের চায়ের দোকানে আজকের চায়ের আড্ডাটা জমেছে বেশ। রাজনীতির মাঠে ‘ভাই’দের রাজত্ব বহুকালের। আর হাল আমলে তো ‘সহমত ভাই’ নামক নতুন এক ভাই শ্রেণিরই উদয় হয়েছে! ভাই লবিংয়ে মিলে যাচ্ছে পোস্ট। পাওয়া যাচ্ছে চাকরি। হচ্ছে প্রোমোশন। সেই প্রসঙ্গ গড়াতে গড়াতে সবাই হিরুকে চেপে ধরল, তার ভাইময় জীবনের ঘটনা বলার জন্য।
‘দ্বিতীয় ঘটনাটা শোন তাহলে।’ হিরু শুরু করল, ‘আমেরিকা থেকে আমাদের এক আত্মীয় বাসায় আসবেন। খাবার-দাবারের আয়োজন আগের দিন থেকেই শুরু হয়েছে।
নির্দিষ্ট দিন সাতসকালে উঠে মা হেঁশেলে ঢুকে পড়লেন। বাবাও শেভ-টেভ করে একেবারে ফিটফাট। এর মাঝে আমাকেও কয়েকবার চাপ দিয়েছেন, শেভটা করে ফেল।
‘ব্যাপারটা রহস্যজনক!’ এই ভেবে আমি আড়ি দিয়ে রইলাম। ফিসফাঁস শুনে বুঝতে পারলাম—মা-বাবা এবার আমার জন্য পাত্রী ঠিক করে ফেলেছেন। বিয়েটা এই যাত্রায় কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু আমি এই বিয়ের জন্য এত সহজে রাজি হলে আর মজা কিসের। দাদার সাদা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরলাম। মাথায়ও হালকা সাদা রং লাগালাম। ব্যস। প্রস্তুতি সারা। এবার অপেক্ষার পালা।
কলিংবেল বাজার পরেও বাসার কারোর কোনো সাড়া নেই। বাধ্য হয়ে আমাকেই দরজা খুলতে হলো।
তিনজন মনিষ্যিকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। মা-বাবার বয়েসী দুজন। আর এক তরুণী তন্বী। অসম্ভব সুন্দর।
পুরুষ লোকটা মুখভরা বিগলিত হাসি নিয়ে আমাকে বললেন, ‘কেমন আছেন ভাইজান?’
‘কাকু, আপনি এত্ত সুইট!’ মেয়েটাও খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল প্রায়।
কথা বললে ধরা পড়ে যাব—এই ভেবে আমি টু-শব্দ না করে তাদের ভেতরে প্রবেশের ইঙ্গিত করলাম। এরপরের ঘটনা বড় ট্র্যাজিক। আমার বেরসিক বাবার কারণে সবার সামনেই পাকড়াও হলাম। মেয়েটা আমাকে পছন্দ করলেও তার বাবা বেঁকে বসলেন। যাকে ভাই ডেকেছি, তাকে কিছুতেই মেয়ে-জামাই বানানো যায় না! এই এক কথায় তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ের মিটিং সেদিন আজীবনের জন্য খতম হয়ে গিয়েছিল।’
‘মেয়েটা প্রথম দেখাতেই তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হলো? কী এমন দেখল তোমার মাঝে?’ হিরুর গল্পের মাঝে একজন ‘অবিশ্বাসী’র দেখা মিলল।
হিরু কিছুটা থমকে গিয়ে শেষে নিজেকে কন্ট্রোল করল। ‘আসলে মেয়েটা আমাকে নয়, আমার সাদা চুলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল! অমন সুন্দর চুল নাকি সে কখনো দেখেনি।’
‘চুল দেখেই প্রেমে পড়ে গেল! নারীর মন আসলেই অদ্ভুত। কখন কিভাবে কার প্রেমে পড়বে, তা হয়তো সে নিজেও জানে না।’ একজন আফসোসের সুরে বলল।
‘আমি ভেবেছিলাম মেয়েটার বাবা নয়, খোদ মেয়েটাই তোমাকে ভাই ডেকে বসবে। তোমার শ্বশুর মহাশয় মেয়ের এই নব্য পাতানো ‘ভাই’-এর সাথে মেয়ের কিছুতেই বিয়ে দিয়ে রাজি হবেন না—এমন কোনো গল্প বলবে।’
আরেকজন বলল, ‘এখনো তোমার খুব আফসোস হচ্ছে, তাই না? আহা! স্বপ্নরাজ্য আমেরিকা, ড্রিমগার্ল অষ্টাদশী সুন্দরী—সবই হারালে!’
‘আরে না। আসল কাহিনিটা তাহলে তোরা জানিসই না। মাকে সেদিন এত এত খাবার বানাতে দেখে খুব লোভ হয়েছিল। জানতাম, আমেরিকা ফেরত ওই তিনজনের সামনে পড়লে মায়ের হাতে বানানো ওই সুস্বাদু খাবার আর অবশিষ্ট থাকবে না। আর আমারও কী ভাগ্য দেখ! আমার সেই পাতানো ভাইটি মানে সেই অষ্টদশীর বাপ এতই গোস্বা করলেন যে, কিছুই মুখে তুললেন না।’ কথাগুলো বলার পরে হিরু এমন ভাবে ঢেঁকুর তুলল যে, কেউ দেখলে মনে করবে—ও খাবারগুলো মাত্রই গলাধঃকরণ করেছে।
তিন.
‘তিন নম্বর গল্পটা শোন তাহলে।
ঘটনাটা কয়েক বছর আগের। এই যেমন এখন তোরা আমার কত্ত কাছের ছোটভাই বনে গেছিস। একজন তো কয়েকদিন আগে কী কাণ্ডটাই না করলি! তখনো আমার এমন কাছের ছোটভাইয়ের কমতি ছিল না। কিন্তু আমি তাদের কাছের ছোটভাই মনে করলেও তারা হয়তো আমাকে কাছের বড়ভাই হিসেবে নিতে পারেনি। তাই নিজেদের অনেক কথাই আমার থেকে গোপন করত।
তেমনই একজন ছিল। নাম বলব না। ধরে নে ওর নাম যদু।
এক বিকেলে দেখি, বেচারা একটি মেয়েকে সঙ্গে করে, বলাবাহুল্য মেয়েটির হাত ধরেই হাঁটছে।
প্রথমে একটু টাস্কিই খেলাম। আগের দিনই ও গলা উঁচু করে বলে গেল, ওর কোনো মেয়ের সঙ্গে রিলেশন নেই। প্রেমের ক্ষেত্রেও নাকি বড়ই আনাড়ি।
তো এই আনাড়ি ছেলেটাই দূর থেকে আমাকে দেখে চট করে হাত ছেড়ে দিল।
‘কী করি, কী করি’ এই ভাবনায় আমি অন্য দিকে চেয়ে ওদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। যখন ওদের ক্রস করব, ঠিক তখনই মেয়েটাকে ভাইয়া সম্বোধন করে কী যেন বলতে শুনলাম।
থমকে দাঁড়ালাম। এখানে মেয়েটার ‘ভাইয়া’ একমাত্র আমিই আছি। তাহলে কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলেছে সে? নিশ্চয়ই আমাকে! আমি যখন ‘জি বলো...’ বলতে যাব, তখন শুনি ওর সেই কথার জবাব দিচ্ছে আমার কাছের ছোটভাই যদু। আগের থেকে এবার দ্বিগুণ চমক খেলাম। বুঝতে আর বাকি রইল না যে, এর সবই যদুর চালাকি। চিত্রনাট্যের পুরো সংলাপ ওরই সাজানো। প্রেমিকাকে দিয়ে ভাইয়া বলিয়েছে। যাতে আমি সন্দেহ না করি।’
‘সত্যিই তো! মেয়েটা ওর বোনও তো হতে পারে। তুমি একটু বেশিই সন্দেহপ্রবণ, হিরু ভাই।’
চ্যালার কথায় কর্ণপাত না করে হিরু বলে চলল, ‘এরপর কয়েক মাস কেটে গেল। একদিন যদু এসে আমার পা চেপে ধরল। মেয়েটির অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তাকে আমার হেল্প করতেই হবে।’
‘হেল্প করলে তুমি?’
‘না রে । অনেক চেষ্টা করেও পারিনি।’
‘ওহহ।’
যদুর কষ্ট সবাইকে স্পর্শ করল বেশ। চুপ হয়ে গেল সবাই। তবে হিরুর গল্প তখনো শেষ হয়নি। ও একটু দম নিয়ে ফের বলতে লাগল, ‘ভাগ্যের পরিহাস, বিয়ের পর মেয়েটির শ্বশুর পক্ষ আমাদের পাড়াতেই এসে ঘাঁটি করল! ক’বছর যেতে না যেতেই বাচ্চার মাও হলো মেয়েটি। বাচ্চাকে রোজই স্কুলে আনা-নেওয়া করে সে। পথে পুরনো প্রেমিকপ্রবরের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয় তার। যদুকে সে এখনো ‘ভাই’ই ডাকে! আর বাচ্চাটা ডাকে ‘মামা’।’
‘আহারে!’ সকলে এখনো যদুর জন্য সমব্যথী।
হিরু স্মিত হেসে বলল, ‘ভাই থেকে যদি বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য মামা জুটে যায়, তাহলে তো ভাই-ই কাফি, কী বলিস তোরা?’
‘তা আর বলতে!’ সকলের মুখেই হাসি ফুটল
এবার। g
