এম এস দোহা
হার্ড লাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোনো আপস নয়। দল ও দেশের স্বার্থে কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। এর ফলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা মাফিয়া, অপরাধীরা এখন দারুণ বেকায়দায়। এদের গডফাদারদের অবস্থাও নাজুক। অতঃপর রাজধানী ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসার অভিযোগে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের ত্রাহি মধুসূধন অবস্থা। সম্রাট, রাজা-বাদশা অনেকেই চিতপটাং। এখন শোনা যাচ্ছে তিন ডজন এমপি নাকি প্রশাসনের নজরদারিতে। ফাদার সংগঠন আওয়ামী লীগেও নাকি শুদ্ধি অভিযান চলবে। যা উপজেলা পর্যায়ে বিসৃত হবে।
অভিযানের ধারাবাহিকতায় সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের দুই নেতার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে টাকা, সিন্দুক ও স্বর্ণের গোডাউনের সন্ধান মিলে। মতিঝিলে ক্লাবপাড়ায় পাঁচটি সিন্ধুক এখনো খুলতে না পেরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নাস্তানাবুদ। ধীরে ধীরে উম্মোচিত হতে শুরু করে আরো অনেক নতুন নতুন রহস্যময় অধ্যায়। থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের লেবেলধারীদের। যারা এক সময় শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, তারাই কীভাবে আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজধানীতে অপরাধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন এ হিসেব মিলানো কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যুবলীগ নেতা সম্রাট ছিল এসব আলোচনার শীর্ষে। তাকে নিয়ে এখনো চলছে ধূম্রজাল।
দেশের সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায়। নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে এক আলোচনা সভায় তিনি বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে অঙ্গীকার করেন। সহযোগিতা চান দলমত নির্বিশেষে সবার। যা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার জন্য ইতিবাচক সংবাদ। দলের লেবেল লাগিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নদী-খাল ভরাট, অন্যের জায়গা জমি দখল, সালিশ দরবারের নামে অবৈধ অর্থ আদায়, থানায় কৃত্রিম মামলা-মোকাদ্দমা সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানিকারীদের তালিকা প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীর গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দেন। তা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কারো কারো কপালে ভাঁজ ও চেহারা মলিন হওয়ার দৃশ্য প্রতীয়মান।
শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর হঠাত্ করে সড়কে হ্রাস পেয়েছে বিলাসবহুল গাড়ির সংখ্যা। রাস্তায় কম-বেশি প্রাইভেট গাড়ি থাকলেও দামি ব্র্যান্ডের গাড়ির সংখ্যা হঠাত্ করে কমে গেছে। একই সঙ্গে গাড়ির শোরুমে বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে আলিশান ডুপলেক্স বাড়ি, ফ্ল্যাট, বাংলোবাড়ির মালিকরা। কারণ টাকা-পয়সা, স্বর্ণ, গাড়ি সবকিছু হস্তান্তর বা লুকানো সম্ভব। বিপদ বাড়ি, ফ্ল্যাট নিয়ে। কারণ এগুলো দৃশ্যমান। ‘হা’ করে তাকিয়ে থাকে। তাই জেলা-উপজেলায় গড়ে ওঠা আলিশান বিস্ময় বাড়িগুলো এখন অনেকের গলায় কাঁটা! প্রভাবশালীদের অনেক পিয়ন-দারোয়ানও বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক। অনেক জেলা-উপজেলায় এমন বাড়ির উদ্ভব হয়েছে, যা দেখতে ভিড় জমে যায়। কোনো কোনো এমপি তৈরি করেছেন ‘রাজপ্রাসাদ’। অনেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র, কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও এদিকে পিছিয়ে নেই। নিজেদের এতদিন রাজা-মহারাজা ভাবতেন তারা। এখন দিন-রাত আতঙ্ক।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কলুষমুক্ত বিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ দেখতে চান দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। দুর্নীতি, অপকর্ম আর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সঙ্গে জড়িতরা দলে আর যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে তেমনটিই প্রত্যাশা তাদের। তাই চলমান অভিযানে খুশি দলের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সর্বস্তরে শুদ্ধি এর মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ করে জনগণের কাছে আওয়ামী লীগকে জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্সে রয়েছেন। শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে বিভিন্ন খাতের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। সচিব থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, সাবরেজিস্ট্রার, পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ । তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার, পাকা রাস্তা, সোডিয়ামবাতি, আর ইটপাথরের বাড়ির মধ্যেই সবকিছু সীমাবদ্ধ নয়। সুশাসনের বিষয়টিও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সুশাসন গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছতে হলে যোগ্য ও যথাযথ জনপ্রতিনিধি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কারণ, মেধাবী, শিক্ষিত ও ভদ্র লোকেরা এখন চেয়ারম্যান, মেম্বার হতে চান না। জাতীয় সংসদে যারা প্রতিনিধিত্ব করছেন তাদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিবিদরা উপেক্ষিত। সম্প্রতি ইউএনডিপির এক আলোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি। যা অনেকটা ‘গরিবের ঘোড়া রোগের দশা।’ আমাদের প্রকল্পগুলোতে যদি ১ শতাংশ কৃচ্ছতা সাধন করা যায়, তাহলে প্রতি বছর ২৫০০ কিলোমিটার গ্রামীণ পাকা রাস্তা বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতি বছর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতো। আর প্রকল্পের দুর্নীতির কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। রূপপুরের পারমাণবিক কেন্দ্রের পুলিশ, ফরিদপুর মেডিক্যালের পর্দা কেলেঙ্কারির ঘটনা এখন ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ। সেই সঙ্গে প্রশাসনের দুর্নীতি, ব্যাংকের ঋণ লুটেরা, শেয়ারবাজার লুট, দেশের ৭৮টি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গরিব গ্রাহকের আমানত আত্মসাত্কারীদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রত্যাশা করে।
গত ১১ বছর সরকার দেশের উন্নয়নে যেভাবে অবদান রেখেছে, সেভাবে দল ও সরকারের ইমেজ বাড়েনি। সরকারের সেক্টর-ভিত্তিক ঈর্ষণীয় উন্নয়ন হলেও তা ম্লান হয়েছে কতিপয় দুর্নীতিবাজ আর সন্ত্রাসীর অপকর্মে। আর এসবের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। যাদের অনেকে ফ্রিডমপার্টি, জামায়াত, বিএনপি থেকে এসে আওয়ামী লীগের লেবেল লাগিয়ে এসব অপকর্ম চালাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করে অপকর্ম, দুর্নীতি, লুটপাট, ভূমি দখল, মাদক ব্যবসায় লিপ্ত। বর্তমান সরকারের আগামী ৪ বছরের শাসনামল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স বজায় রাখলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিশ্ব দরবারের উন্নত শিখরে পৌঁছাতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।
n লেখক : গবেষক ও লেখক
