প্রথমবারের মতো যাচ্ছি গুরুদেবের জন্মস্থানে তাই মনের ভেতর কে যেন তাড়া দিচ্ছে কতক্ষণে পৌঁছাব। জাকারিয়া স্ট্রিটের নাখুদা মসজিদ, চিতপুর রোড দিয়ে এগিয়ে চলেছি। শেষ পর্যন্ত দেখা মিলল বিশাল বড় পাকা তোরণে লেখা ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি’। এর পরই বেশ খানিকটা ঘিঞ্জি গলি, ভেতরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ। সেখান থেকে খানিকটা ভেতরেই মিউজিয়াম। ঠাকুর বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা যেমনই হোক, বাড়িটা দেখার মতো। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে দ্বারকানাথ ঠাকুর বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন বড় বাজারের শেঠদের জমিতে। ধীরে ধীরে এই পাড়া হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের বহু বিখ্যাত ঘটনার সাক্ষী। এ পাড়াতেই থাকতেন ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’র কালী প্রসন্ন সিংহ; ভারতবর্ষে জুলিয়াস সিজার নাটক প্রথম অভিনীত হয়েছিল যার বাসায়, সেই পিয়ারী মোহন বোস; মাইকেল মধুসূদনের ‘কৃষ্ণকুমারী’ প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল যাঁর উদ্যোগে, সেই জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরো বেশ কজন বিখ্যাত মানুষ।
সবুজ ছোট-বড়ো বৃক্ষাদির শাখা-প্রশাখা আর পত্রপল্লবে ঘেরা চারদিক। তারই ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাল রঙের বিশাল আকৃতির একাধিক দালান। মাঝে বিশাল সবুজ চত্বর দেখেই মনে হয় বসে পড়ি ঘাসের কোমল ছোঁয়া পেতে, কিন্তু মিউজিয়ামে তাড়াতাড়ি ঢোকার লোভও সামলাতে পারছি না। ২০ রুপি দিয়ে টিকিট কাটলাম, খুব শখ করে ক্যামেরা বের করলাম, কিন্তু ভাগ্য খারাপ, ক্যামেরা নিয়ে মিউজিয়ামে ঢোকা যায় না। প্রবেশ পথে রয়েছে সর্বাধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। আবার জুতা পায়ে প্রবেশ করা যায় না। প্রথমে এ নিয়ে মন খারাপ লাগলেও পরে তাদের কবিগুরুর প্রতি সম্মান দেখে আমরা খুব মুগ্ধ হই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা প্রিন্স দ্বারাকানাথ ঠাকুর তার দাদা নীলমনি ঠাকুর এই বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে পুরো এলাকাটি ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি’ নামে বিখ্যাত। তবে এখন ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি’ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাঙ্গণ। প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকার ঠিক বাঁ দিকের দালানটি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রবেশপথের ডান দিকের একটু ভেতরে একচালা গ্যারেজে রাখা আছে কবির ব্যবহূত গাড়ি। খোলার দিনে এই জায়গা প্রতিদিন অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে এখানে আসে বহু রবীন্দ্রভক্তের দল। এমনকি বন্ধের দিনও মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে। তার সঙ্গে এই শহরের অনেকেই প্রতিদিন আসেন। রবীন্দ্র-ভাবনা নিয়ে বসে থাকেন জোড়াসাঁকোর বাড়ির এদিক-সেদিক তার অবসরের সময়টুকুতে। এখানে কেউবা ব্যস্ত কি যেন লেখার মধ্যে, কেউবা অকারণে বসে আছে সবুজ চত্বরে, কেউবা ঘুরে ঘুরে দেখছে। আবার অনেকে একসঙ্গে গোল করে বসে আলোচনায় মশগুল। তবে সবার চোখে-মুখে কী এক অপার শান্তি! তবে মনে রাখতে হবে, ছুটির দিনে সব খোলা থাকে না। নিচতলায় টিকিট কেটে, সিঁড়ি ঘরের নিচের লকারে ক্যামেরা, মোবাইল, ব্যাগ এসব রেখে, জুতা খুলে আমরা বাড়ির ওপর তলায় গেলাম।
ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকি, একসময় সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাই, দেখতে পাই রবি ঠাকুরের ব্যবহূত জিনিসপত্রগুলো উপরতলায় বিভিন্ন ঘরে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। শুরুতেই কবিগুরুর খাবার ঘর। এরপর শয়ন কক্ষ। ভেবেছিলাম খুব একটা বড় হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা গেল বাড়িটি বিশাল। প্রতিটি ঘরেই রয়েছে রবি ঠাকুরের স্মৃতিচিহ্ন। কোনো কোনো ঘরে তাঁর ব্যবহূত পোশাক, আরাম কেদারা, বইপত্র, বিলেত থেকে আনা জিনিসপত্র। রয়েছে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ছবি। একটি ঘরে রয়েছে রবি ঠাকুরকে নিজ হাতে লেখা মৃণালিনী দেবীর চিঠি, তার ওপর মৃণালিনী দেবীর একটি বড় ছবি টানানো। এই ঘরেই মৃণালিনী দেবীর শেষশয্যা পাতা হয়েছিল। গোটা ঠাকুর বাড়িতে প্রতি মুহূর্তে বাজছে তার সংগীতের অসাধারণ সব সুর। খাবার কক্ষটিও দেখে মনে হলো, কবি এখানেও খেতে খেতে গাইতেন। কারণ খাবার টেবিলের ধরনটাও সংগীত কক্ষের মতো করে সাজানো। পরের ঘরটিতে কবি শুয়ে কাটাতেন জীবনের শেষ সময়টা। সেখান থেকে বের হয়েই দেখা গেল, কলকাতার বিখ্যাত বাংলা দৈনিক আনন্দ বাজারে প্রকাশিত কবির জীবনের শেষ দিনটির কথা। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট প্রকাশিত আনন্দ বাজার দেখে একটু অবাকই হতে হলো। সেখানে লেখা আজ প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা ৬৫ হাজার। পত্রিকার পাতাজুড়েই কবির শেষ যাত্রার সংবাদ আর কবিতা। তখনকার পত্রিকার প্রকাশ সংখ্যা দেখে বুঝা যায়, কতটা জোরালো ছিল শিক্ষার মান। ঠিক সেখানেই একটি কক্ষে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। কালো ফ্লোর মাঝে জল চৌকিতে জ্বলছিল তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় থাকা ধূপবাটি। সেখান থেকে বের হয়ে কিছু দূর যেতেই দুই দরজার ছোট্ট একটি ঘর। সেখানে আলো খুব একটা নেই। দরজার বাইরে লেখা, ‘এখানেই জন্ম নিয়েছিল কবি ঠাকুরের সকল বংশধর। মানে কবি গুরু আঁতুড় ঘর। এই আলোহীন ঘর থেকেই বিশ্বকে আলোকিত করেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস, সংগীতে। রবীন্দ্রনাথ যে বোটে করে ঘুরে বেড়াতেন পদ্মায় সেই বোটের একটি চমত্কার প্রতিকৃতিও আছে এখানে, বাংলাদেশ সরকারের উপহার হিসেবে। তিন তলায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আর সারদা দেবীর ঘরসংসার। রবীন্দ্রভারতী মিউজিয়ামের লাইব্রেরিটিও সমৃদ্ধ নানা দুষ্প্রাপ্য বইয়ে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নাল এখানে নিয়মিত আসে। এখানে সানজিদা খাতুনের বই দেখে ভালো লাগল। মোট ৪টি ভবনের ১৮টি গ্যালারিজুড়ে রবীন্দ্রভারতী মিউজিয়াম। ১৯৪১-এর ৩০ জুলাই মাসে এ ঘরেই কবিগুরু তাঁর শেষ কবিতা, ‘তোমার সৃষ্টির পথ’-এর ডিক্টেশন দিয়েছিলেন। এর মাত্র সাতদিন পর তিনি পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। পাঁচটায় বন্ধ হয়ে যায় ঠাকুর বাড়ির দরজা। বাইরে বের হয়ে আমরা কিছু ছবি তুলি। রবীন্দ্রনাথের বাড়ির সবকিছুই মনে হয় কোনো না কোনোভাবে আমাদের চেনা জানা। এর কারণ খুঁজে পেলাম বেরিয়ে আসার সময় মূল প্রবেশদ্বারের পাশে লেখা পরিচয় কবিতার শেষ কটি লাইন দেখে, ‘সেতারেতে বাঁধিলাম তার, গাহিলাম আরবার, মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক, আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।’
