আমাদের অনুভূত বিভিন্ন ধারণার মধ্যে শক্তির স্থান সর্বপ্রথম। প্রতি পদক্ষেপে আমরা তা অনুভব করি। শারীরিক শক্তি বিকাশের তারতম্যের কারণে কেউ সবল কেউ দুর্বল। মানসিক শক্তির তারতম্যে কেউ পণ্ডিত, ঐশ্বর্যশালী, ক্ষমতাবান আবার কেউ মূর্খ, শ্রীহীন। সর্ষপতুল্য বীজ থেকে বেড়ে উঠছে বিশাল বৃক্ষ। দেশ ও জনপদ কখনো পর্বতায়িত বা কখনো সমুদ্রকবলিত হচ্ছে। আবার সমুদ্র থেকে উত্থিত হচ্ছে জনপদ। কথায় আছে ‘শতবর্ষে জনপদ, আবার ‘শতবর্ষে অরণ্য’। সর্বত্রই যেন শক্তির লীলাখেলা। আগুন ছাড়া যেমন দাহিকা শক্তি কল্পনা করতে পারা যায় না, তেমনি শক্তিমান ছাড়া শক্তি কিংবা শক্তি ছাড়া শক্তিমান কল্পনা অসম্ভব। জগত্ ব্যাপারের পশ্চাতে যে অনন্ত ও অখণ্ড শক্তি ক্রিয়াশীল তাকে ভক্তরা ‘মা’ বা ‘ভগবতী’ বলে থাকেন। দুর্গাপূজা প্রতিমায় সর্বব্যাপিনী মাতৃশক্তির আরাধনা।
সাধারণে ‘কলাবৌ’ নামে সুপরিচিত যে মাতৃপ্রতিমা হলুদ শাড়িতে শোভিত হয়ে দেবীদুর্গা কাঠামোর ডানে ও নিম্নদেশে কাষ্ঠাদি-নির্মিত আসনে অবস্থান করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তিনি শাস্ত্রীয় ভাষায় নবপত্রিকাদুর্গা নামে অভিহিত। কদলী, কচু হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম্ব, অশোক, মানকচু ও ধান্য—এ নয়টি বৃক্ষ বা এর অংশবিশেষের সন্নিবেশে তৈরি নবপত্রিকা শারদীয় দুর্গাপূজার সপ্তমী দিন নির্ধারিত স্থানে স্থাপন করা হয়। বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিরা বলে থাকেন, সৌরশক্তি ক্ষেত্রবিশেষে আলোক, তাপ, বিদ্যুত্, রাসায়নিক ইত্যাদি শক্তিরূপে প্রকাশিত হয়ে থাকে। নবপত্রিকার প্রতিটি বৃক্ষ শক্তিরূপিনী মা দুর্গারই বিভিন্ন শক্তির প্রতিভূ। শক্তি-অনুবন্ধী একেক দেবীর অধিষ্ঠান রয়েছে একেক বৃক্ষে। কদলীতে অধিষ্ঠান দেবী ব্রহ্মানীর, কচুতে কালিকা, হরিদ্রাতে দুর্গা, জয়ন্তীতে কার্ত্তিকী; বেলের অধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বের রক্তদন্তিকা; অশোকের দেবী শোকরবহিতা, মানকচুর চামুণ্ডা ও ধানের লক্ষ্মী। বৃক্ষসমূহে অধিষ্ঠাত্রী দেবীগণ মা দুর্গারই বিভিন্নরূপ। নবপত্রিকাদুর্গার প্রণাম বা স্নানের মন্ত্র থেকে দেবীশক্তির বিভিন্ন রূপ প্রকাশ সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। ব্রহ্মানী পালনকারী শক্তি এবং সর্বত্র শান্তি বিধানকারী, কালিকা সর্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী। দুর্গা বিঘ্ননাশকারী ও শান্তি প্রদায়িনী। কার্ত্তিকী জয়প্রদান করেন। শিবা বিজয় বর্দ্ধন করেন এবং যা জীবের মঙ্গলজনক তারই ব্যবস্থা করেন। জীবের পাপ ও ক্ষুধা নাশ করেন রক্তদন্তিকা। শোকরহিতা জীবের শোক দূর করেন। চামুণ্ডা মানদান করেন। মহালক্ষ্মী জীবের প্রাণদায়িনী ও প্রাণরক্ষকারী। বিধিমোতাবেক স্নান, সপ্তমীতে ষোশোপাচার ও পূজার অন্যদিনে পঞ্চোপাচারে নবপত্রিকাদুর্গাকে পূজা করা হয়।
আমাদের যুক্তিবাদী ও সন্ধিগ্ধ মন কেবলমাত্র পৌরাণিক কাহিনীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে পূজানুষ্ঠানে আগ্রহী নয়। বিভিন্ন শক্তির কল্পনা বিভিন্ন বৃক্ষে করতে হবে কেন? বৃদ্ধরা বলে থাকেন এবং আমাদের যুক্তিবাদী মনও এটা স্বীকার করে যে, সূক্ষ বিষয়ের ধারণা করতে গেলে প্রাথমিকভাবে স্থূল জিনিসের সাহায্য নিতে হয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করছেন, ‘হে ভগবন্, মুনি-ঋষিগণও যেহেতু আপনাকে সহজে ধারণা করতে পারে না, সেহেতু নিয়ত আপনার চিন্তা করা ও আপনাকে যথার্থভাবে জানা তো আমার মতো ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। আপনি কৃপা করে বলুন—কীভাবে নিরন্তর আপনার চিন্তায় মগ্ন হতে পারি। ভগবান বলছেন, আমার বিভূতি (নানারূপে প্রকাশ) সমূহের মধ্য দিয়ে আমার নিরন্তর চিন্তা করা সম্ভব; দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে আমি বিষ্ণু, প্রকাশকগণের মধ্যে সূর্য, ইন্দ্রিয় সকলের মধ্যে মন ও বুদ্ধি, বৃক্ষ সকলের মধ্যে অশ্বথ, মনুষ্যগণের মধ্যে রাজা... যা কিছু ঐশ্বর্যযুক্ত, শ্রীসম্পন্ন উত্সাহশীল সেই সকলই আমার শক্তির অংশসম্ভুত বলে জানবে।’ দুর্গাপূজায় সাধকও পৌরাণিক আখ্যানের বর্ণিত দেবতাসকলের প্রতিভূ নবপত্রিকা প্রতিমার বৃক্ষসমূহে সর্বশক্তিময়ী দেবীর বিভূতি চিন্তনের মাধ্যমে তাকেই অনুধ্যান করার প্রয়াস পায়। ভক্ত শুদ্ধচিত্তে উপলব্ধি করেন—মা’ই সব হয়েছেন, মায়ের শক্তিতে সব হচ্ছে; তিনি যন্ত্র, মা যন্ত্রী। তার বিভূতি ও যোগ অর্থাত্ তিনি বিভিন্নরূপ হয়ে হয়েছেন, আবার তিনিই এ সকলের স্রষ্টা, সর্বেশ্বর, সকল শক্তির উত্স—তাকে এভাবে জানলেই সম্যগ্দর্শন হয়। সম্যগ্দর্শন লাভ করে জ্ঞানী ভক্ত সংসার মোহ, মহত্ ভয় ও দুঃখ থেকে পরিত্রাণ লাভ করেন।
অহংকারের বশবর্তী হয়ে আমরা মনে করি, আমিই এরূপ অসম্ভব, অপূর্ব কাজ করেছি। আমার শক্তিতে এ অসাধারণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমাকে ছাড়া এ কাজ অসম্ভব। বুদ্ধির সামর্থ্যের কথা ভেবে উত্ফুল্লবোধ করি, অন্যের প্রশংসা বা স্তূতি বাক্যের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি কিংবা অন্যের প্রশংসায় উদ্বেলিত হই। দম্ভ ও মদান্বিত হয়ে নিজেকে জাহির করার চেষ্টায় তত্পর হয়ে উঠি। নিজের শ্রেষ্ঠতা খ্যাপনে ও আধিপত্য স্থাপনে গর্ববোধ করি। শ্রীরামকৃষ্ণের উপমা আছে—নিচে আগুন জ্বালা আছে, তাই হাঁড়ির ভেতরে ডাল, ভাত, আলু, পটোল সব টগবগ করছে। লাফাচ্ছে, আর যেন বলছে, আমি আছি, আমি লাফাচ্ছি। শরীরটা যেন হাঁড়ি; মন, বুদ্ধি—জল; ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলো যেন—ডাল, ভাত, আলু, পটোল। অহং যেন তাদের অভিমান, আমি টগবগ করছি! আর সচ্চিদানন্দ অগ্নি। যখন আমরা জগত্ থেকে নিজেকে পৃথক করে দেখি এবং সর্বব্যাপিনী মহাশক্তি সম্পর্কে বিস্মৃত হই তখন জগত ব্যাপরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ণতা পায় না। জগত ব্যাপারে এরূপ আংশিক ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অনৈতিক, পশুভাবাপন্ন ও হিংসাপরায়ণ করে তোলে। বারংবার আঘাতে নিষ্পিষ্ট হয়ে যখন আমাদের দুষ্ট স্বার্থপর মন মরে যায়—তখন আমরা জেগে উঠি এবং মায়ের সত্তা অনুভব করি। তখন মায়ের প্রতি আমাদের শরণাগতি আসে। তার প্রতি অকুণ্ঠ শরণাগতিই আমাদের প্রকৃত শান্তি ও আনন্দ দিতে পারে। দুর্গাপূজা তথা নবপত্রিকা-মায়ের পূজার মাধ্যমে ভক্ত শক্তিরূপিণী মা’কে সর্বত্র উপলব্ধি করার এবং তাতে শরণাগত হবার প্রয়াস পায়। সর্বব্যাপিনী, শক্তিময়ী, শক্তিদায়িনী মা দুর্গাকে প্রণাম—
যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা
নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ
n লেখক :মহারাজ, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঢাকা
