শারদোত্সব ও আজকের ভাবনা

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ২১:২৮

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উত্সব। তন্ত্রশাস্ত্রের অন্যতম গ্রন্থ হচ্ছে ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’। এই চণ্ডী গ্রন্থে দেবী দুর্গার আবির্ভাব এবং তার কর্মকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। আদিকালে পূজিত চণ্ডী দেবীই পরবর্তীকালে দুর্গার রূপ ধারণ করেছেন বলে অনেক বাঙালি সামাজিক নৃতাত্ত্বিকের ধারণা। তাই বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাস পরিক্রমায় এক সময় ‘চণ্ডীমণ্ডপ’ ‘দুর্গামণ্ডপ’-এ পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজা শক্তি পূজার এক বিশেষ রূপ। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে ভগবতী ও কালী এ দুজনই আদ্যাশক্তিরূপে পূজিত। ভগবতী দেবী দুর্গারই আরেক নাম। দেবী ভগবতী তান্ত্রিকবাদের সূত্রেই বাংলার হিন্দু সমাজে সাংবাত্সরিক পূজ্য সত্তা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। মাতৃকেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দু তার হারানো মাকে খুঁজে পেল এবং তান্ত্রিকবাদের মূলনীতি অনুসারে দৈনন্দিন সব কর্মকে শক্তি পূজার অঙ্গবিশেষ বলে মনে করতে লাগল। দেবী কালী তপস্যার বলে শিবকে প্রসন্ন করেছেন, এজন্য তিনি হলেন গৌরাঙ্গী। তিনিই পরে গৌরী অর্থাত্ দুর্গা বলে খ্যাত হলেন। দুর্গাপূজা অনুষ্ঠানের পৌরাণিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে পঞ্চদশ শতকের বাঙালি কবি কৃত্তিবাস প্রণীত রামায়ণে। রামায়ন অনুযায়ী ত্রেতাযুগে অযোধ্যার রামচন্দ্র শরত্কালে দুর্গাপূজা করেছিলেন। এই পূজার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার কাছ থেকে শক্তি সঞ্চার করে রামচন্দ্র লঙ্কার রাজা রাবনকে হত্যা করে তার অধীনে বন্দিনী স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করেছিলেন। অর্থাত্ দুর্বিনীত ও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অন্যায় ও অবিচারের প্রতিকার লাভের চেতনাই দুর্গোত্সবের মর্মবাণী। রামায়ণে বাঙালির সামাজিক জীবনের প্রধান আনন্দোত্সব তথা রামচন্দ্রের শারদীয় দুর্গোত্সব— অকাল বোধনের কথা রয়েছে।

প্রাচীন পুঁথিপত্র থেকে জানা যায়, বাংলায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্গাপূজার প্রচলন হয় ষোড়শ শতকে। প্রথমদিকে এ পূজা ক্ষুদ্র ধনিক শ্রেণির মাঝেই অনেকটা সীমাবদ্ধ থাকে। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ আমলের শুরুর দিকে দুর্গাপূজা বাংলাদেশে ধনী জমিদার ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির পারিবারিক পূজায় পরিণত হয়। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে বঙ্কিমচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় বাংলার লৌকিক দেবী দুর্গা দেশমাতৃকার বন্দনায় রূপান্তরিত হন। এসব কীর্তিমান সাহিত্যিকের মাতৃভুমির বন্দনায় লোক-ভাবনা নতুন রূপ পায়। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী বিনয় সরকারের ভাষায়, ‘দেবী দুর্গার আরাধনাই দেশমাতৃকার আরাধনা আবার দেশমাতৃকার আরাধনাই দেবী দুর্গার আরাধনা।’ রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন—‘ভালবাসার অপর নাম যদি পূজা হয় তাহলে দুর্গাপূজার আসল অর্থ হচ্ছে নিজের দেশকে ভালোবাসা, সব ধরনের দুর্গতি দূর করে একে সুখী সমৃদ্ধরূপে গড়ে তোলার আকাঙ্খা।’

বাঙালির সমন্বিত ঐতিহ্যকে নজরুল যেভাবে সাফল্যের সঙ্গে ধারণ করেছিলেন সেভাবে বোধকরি আর কোনো কবি পারেননি। এখানে নজরুল অদ্বিতীয়। তার কবিতায় হিন্দু পুরাণ ও ইসলামী ঐতিহ্য সমান নৈপুণ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। হাম্দ-নাত ইসলামী গান ও শ্যামাসংগীত-বৈষ্ণবপদ রচনায় যে বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর নজরুল রেখেছেন তা এককথায় নজিরবিহীন।

দুর্গাপূজা উত্সবটি নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চৈতন্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। ‘আনন্দময়ীর আগমণে’ ও ‘পূজা অভিনয়’ কবিতায় দেবী দুর্গাকে নজরুল শুধু ঐশী শক্তির অধিকারী হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন সামাজিক অনাচার, কূপমণ্ডূকতা, হিংসা-বিদ্বেষ, ভণ্ডামি ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধ-প্রতীক রূপেও।

কিন্তু সেই চেতনা কি একালের দুর্গাপূজায় উপস্থিত? নজরুল দেখিয়েছেন এই পূজায় আড়ম্বরই হয়ে উঠে বড়ো, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়াসটি হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন। আড়ম্বরসর্বস্ব দুর্গাপূজাকে তাই তিনি বলেছেন ‘পূজা অভিনয়’।

দুর্গাপূজার এমন তাত্পর্য হূদয়ঙ্গম করতে পারলে এই উত্সব শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সার্বজনীনতা স্পর্শ করে অন্যসব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকেও। সৃষ্টি হয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মাঝে একতা ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন। আশা ও আনন্দের কথা, এইরূপ একতা ও সম্প্রীতির বিষয়টিকে এ অঞ্চলের মানুষ সবসময়ই বড়ো করে দেখে এসেছে, দেখে অভ্যস্ত। দশমুখো ধনিক রাবণের বিশ হাতব্যাপী লুণ্ঠনকে প্রতিরোধ করার মধ্যেই শারদীয় দুর্গোত্সবের মর্মবাণী নিহিত। দুর্গাপূজার এমন সার্বজনীন বাণীকে মর্মে ধারণ করেই এই উত্সবটিকে আরো সার্থক এবং অর্থবহ করে রাখা যায়।

n লেখক :কলেজ শিক্ষক