বৃষ্টিতে ওরা

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:২৮

শিপু ছড়া কাটছিল আপন মনে। বারান্দার এক কোণে। বাইরে দৃষ্টি মেলে দিয়ে ছন্দে ছন্দে তাল মিলাচ্ছিল ছড়ার।

‘টাপুরটুপুর বৃষ্টি পড়ে চালে আর ডালে; শব্দ করে ঝামুর-ঝুমুর পড়ে তালে তালে।’

সেদিন শিপুদের বারান্দায় সকালে এক আসর জমে উঠল। লক্ষ্মী, হাসি আর সামুসহ শিপু পুতুল খেলায় মাতে। নানা রঙের কত পুতুল। কোনোটা কাঠের, কোনোটা কাপড়ের, কোনটা আবার তুলার তৈরি। পুতুলগুলো দেখতে ভারী সুন্দর। শিপুকে এসব এনে দিয়েছেন মেজো কাকু। মাঝে মাঝে রাতে ডাক্তারখানা থেকে কাকা বাসায় ফেরার পথে শিপুর জন্য ওর সংসারের রকমারি খেলনাসামগ্রী নিয়ে আসেন। তাই শিপুর কাছে কাকু মজার লোক।

সবাই নিজেদের পুতুল নিয়ে ব্যস্ত। শিপুর তিনটে পুতুলই মেয়ে। কখনো বড়োটাকে নতুন নতুন কাপড় পরায়, কখনো আবার ছোট পুতুলটার দিকে দৃষ্টি বাড়ায়।

তিনটে মেয়ের মধ্যে শিপুর বড়োটার নাম পল, আর ছোট দুটো ডল ও রল।

পল ভারি দুষ্টু। একটুও কথা শোনে না। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। তাই পলকে নিয়ে শিপুর ভারি চিন্তা।

পল ধীরে ধীরে যতই না বড়ো হচ্ছে, শিপুর চিন্তাও সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে। তাই খেলার এক ফাঁকে হাসিকে বলল, ‘দেখ ভাই, তোমার ছেলের তো কম বয়স হয়নি, তাই বলছিলাম কি, ওই যে আমার মেয়ে পল, তোমার ছেলে মোটুসির সঙ্গে বিয়ের কথাটা পাকাপাকি করে ফেল বাপু।’

হাসি বলল, ‘ঠিক আছে গো ঠিক আছে। কবে দিতে চাও তোমার মেয়েকে?’

—কালকে তো শুক্রবার কালকেই না হয়...।

—আচ্ছা আচ্ছা।

খেলতে খেলতে দুপুর গড়িয়ে যায়। এলো বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে। শিপুর ধারণা আকাশে একজন কুঁজো বুড়ো বসে বসে এ কাজ করে। কাজ তো আর নেই, তাই সময়ে অসময়ে জল ফেলে। আর সে থেকেই বৃষ্টি।

একসময় বৃষ্টি থামে। ওরা সবাই খেলা শেষে বাসায় ফেরে।

কাকু ডাক্তারখানা থেকে ফিরে দুপুরের খাবার সেরে নিলেন। পান মুখে পুরে দৈনিক কাগজ নিয়ে হেলানো চেয়ারে বসেন। কানাই মাস্টারের মতো চশমার ফ্রেমের ফাঁক দিয়ে একবার ওপরে আরেকবার মাঝখানে নিউজের হেডলাইন দেখতে দেখতে বলেন, ‘কী রে শিপু, তোর পুতুল খেলা শেষ হলো?’

—হ্যাঁ কাকু। গুছিয়ে ফেলেছি। জানো কাকু, পলের না বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

‘আচ্ছা আচ্ছা। কার সঙ্গে শুনি?’ কাকু গোল গোল চোখে মাথা ওঠানামা করেন।

—ওই যে ভুঁইয়া বাড়ির হাসি। ওরই ছেলে পুতুলের সঙ্গে।

বিকেল গাড়িয়ে যায়। শিপুর ভাই দীপু স্কুলশেষে বাসায় ফেরে। দীপুর মনটা ভালো নেই। কাল রাতে সারাক্ষণ টিভি সেটের রঙিন মিনি পর্দায় ছিল তার চোখ। চোখদুটো উদ্বেগে ও আবেগে তেঁতে উঠছিল তার। দীপুর প্রিয় দল হেরে গেছে। মেসি যখন পেনাল্টি মিস করল, তখন সারা ঘরের পরিবেশ পাল্টে গেল। অর্থাত্ তার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

কয়দিন পরেই স্কুল থেকে প্রোগ্রেস রিপোর্ট দেবে। স্কুল ফাইনালে ভালো রেজাল্ট না হলে মা ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেবেন না। পূজায় বায়না ধরা উপহারও বাদ! প্রিয় দলের পরাজয় এবং ক্রিকেট ব্যাট না পাওয়ার দুঃখে দীপু কাতর।

রাতে শিপু একটা খারাপ স্বপ্নের মুখোমুখি হলো। ও দেখল ছোড়দা দীপু ওর সব পুতুল নদীতে ফেলে দিয়েছে। পল, ডল আর রল ভাসতে ভাসতে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। হঠাত্ একসময় ওদের খাওয়ার জন্য কুমিরগুলো এগুতে থাকে। শিপু আর স্থির থাকতে পারে না। ঘুমের মধ্যে শুধু চিত্কার করে বলতে লাগল, ‘মেজো কাকু। ওই যে আমার পুতুলগুলো... বাঁচাও...বাঁচাও!’ এমন কাণ্ডে সবার ঘুম ভেঙে যায়।

পরদিন সকালে টিফিন সেরে বল নিয়ে বেরুনোর জন্য দীপু প্রস্তুত। ওদিকে আজ শিপুর পুতুল বিয়ে। তাই পলকে নিয়ে সে ব্যস্ত। ঘর থেকে দীপু পা বাড়াল মাঠের দিকে। আর অমনিতেই শিপুর মুখে ছড়া—

আয় বৃষ্টি ঝেঁপে

দীপুকে দে খেপে!

আয় বৃষ্টি নিয়ে

পলকে দেব বিয়ে!

দীপু শুনতে পেয়ে দৌড়ে এসে শিপুর গালে এক চড় বসিয়ে দিল।

‘তোর সব পুতুল ফেলে দেব। কিভাবে পুতুলের বিয়ে হয় আমি দেখব।’

হৈচৈ শুনে কাকু ও মা ছুটে আসেন।

দীপু এবার ক্লাসে ফাইভে। ফুটবলে ওর দারুণ নেশা, বৃষ্টি ওর কাছে বড় শত্রু। বৃষ্টিতে যেমন পথচলায় অসুবিধে, তেমনি খেলতে ভারি কষ্ট হয়। তাই বৃষ্টি হলে মা মাঠে যেতে দীপুকে নিষেধ করেন। দীপু ভেজা মাঠে খেলতে যায় না। মায়ের কথা শুনে বলে মা দীপুকে খু-উ-ব ভালোবাসেন।

ক’দিন ধরে কয়েকটি খেলা দীপু টেলিভিশনে দেখছে? মেসির খেলা দেখে দীপু সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছে। তবে প্রিয় দল হেরে যাওয়াতে দীপুর খারাপ লেগেছে।

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছিল। শিপুর আনন্দ, কিন্তু দীপুর বুক ফেটে কান্না আসে।

এমন ছুটির দিনে দীপু টুপটাপ বৃষ্টিকে মানল না, গৌতম, রাজনকে নিয়ে নাচতে নাচতে বেরিয়ে পড়ল। সেও ছড়া কাটল—

যা বৃষ্টি যা

শিপুর পুতুল খা

যা বৃষ্টি যা!