সরকার নামক বিপুলবিরাট বটবৃক্ষের ছায়াতলে আশ্রয় লইয়া যাবতীয় অপকর্ম বা দুষ্কর্ম করা যায় সবচাইতে সহজে। এইক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের ‘ছায়া’ অপকর্মকারীদের নিকট শক্ত ‘ঢাল’ হিসাবে কাজ করে। এইজন্য আমরা দেখিতে পাই, ক্ষমতাসীন দলের সাইনবোর্ড এবং সেইখানে বড়ো নেতা-নেত্রীর হাস্যোজ্জ্বল পেনোফ্লেক্স ঝুলাইয়া রাস্তার পাশে বা যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গার জমি দখল করিয়া গড়িয়া তোলা হয় দলীয় কার্যালয়। ইহার পর ঐ কার্যালয় হইয়া ওঠে অপকর্মকারীদের নিরাপদ আস্তানা।
রাজকুমার হিরানি পরিচালিত বহুল জনপ্রিয় হিন্দি ছবি ‘পিকে’-তে দেখা যায়, এলিয়েনরূপী আমির খান একটি মন্দির এলাকায় চুরির অপরাধে নিজেকে বাঁচাইতে দেবদেবীর ছবি তাহার নিজের গালে লাগাইয়া নেয়, ফলে কেহ আর তখন তাহাকে থাপ্পড় মারিতে পারে না। কারণ, থাপ্পড় মারিলে উহা দেবতার ছবির গায়ে গিয়ে পড়িবে। ইহার ফলে শাস্তিদাতারা পিছাইয়া যায় আমিরকে তাহার অপরাধের শাস্তিপ্রদানে। নেতা-নেত্রীর ছবি ঝুলাইয়া বিবিধ অপকর্মকারীদের সহিত ঐ ঘটনার সাদৃশ্য খুঁজিয়া পাইতে পারেন কেহ কেহ। ক্ষমতাসীন দলের সামিয়ানার নিচে যাহারা মাদক পাচার হইতে শুরু করিয়া বিবিধ অপকর্ম করে, তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইতে যদি সেই দলীয় কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়, তাহা হইলে ঐ দলীয় কর্মীরা তত্ক্ষণাত্ এই অভিযোগ তোলেন যে, অভিযানের নামে নেতা-নেত্রীর ছবি ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছে। স্বাভাবিকভাবেই ইহা ক্ষমতাসীন দলেরও মনপসন্দ হয় না। ইহার ফলে একটি ভালো অভিযান যেই কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সংঘটিত হইয়াছে, অনেক সময় তাহাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা লওয়া হয়। এই কারণেই প্রশাসনের লোকেরা চোখের সামনে ক্ষমতাসীনদের কোনো খুন খারাবি করিতে দেখিলেও অনেক সময় অ্যাকশন লইতে পারে না। অন্যদিকে কোনো ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা যদি ক্ষমতাসীনের দলের ছায়াতলে থাকেন, তাহারা আবাসিক হলে থাকুক কিংবা বাহিরে থাকুক, ন্যায়-অন্যায় সবই করিতে পারেন। ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, যুগে যুগে ক্ষমতাসীন দলের লোকদের অলিখিত অঙ্গুলিহেলনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ঘটনা ঘটিয়াছে। তাহারা নিয়ন্ত্রিতও হন নানানভাবে। সুতরাং সরকার যদি কোনো অন্যায়ের ব্যবস্থা লইতেও চাহে, তবে ভিতর হইতেও এক ধরনের বাধা তৈরি হয়। কেবল তাহাই নহে, এই সমস্ত ক্ষমতাসীন দলের লোকদের সহযোগিতা করিবার মাধ্যমে প্র্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগাইয়া আসে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। স্মর্তব্য যে, ইহা কোনো একটি বিশেষ দলের জন্য প্রযোজ্য নহে, পাকিস্তান আমল হইতেই এই ধারা চলিয়া আসিতেছে। এবং ইহা এখন সর্বত্রই প্রচলিত।
সুতরাং এইসব তথাকথিত ‘বিদগ্ধ’ দলীয়কর্মীদের কথায় বা প্রভাবে যদি সব কিছু চলে, আর তাহা যদি বন্ধ করা না হয়, তাহা হইলে কোনো কিছুতেই কিছু হইবে না। সরকারের কোনো সদিচ্ছা বা ব্যবস্থা গ্রহণই কোনো কাজে আসিবে না। সুতরাং রাজনৈতিক দলের যথোপযুক্ত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ এই সকল অপকর্ম বন্ধ করিতে হইবে।
