চারিদিকে অস্থিরতা ও নেতিবাচক খবরের মধ্যে যদি একটু ইতিবাচক সংবাদ পাওয়া যায়, তাহা হইলে তাহার চাইতে স্বস্তিদায়ক আর কীবা হইতে পারে! মানুষ বরাবরই আশাবাদী। নানাভাবে তরুণ সমাজের বিপথগামিতা নিয়া অভিভাবকবৃন্দ যখন উত্কণ্ঠিত, তখন একশ্রেণির তরুণের ইতিবাচক উদ্যোগ ও তাহাদের শুভচিন্তার প্রতিফলন দেখিয়া আমরা উচ্ছ্বসিত না হইয়া পারি না। এমনই এক উদ্যোগ হইল সেন্টমার্টিন হইতে ৫৫৫ কেজি বর্জ্য পরিষ্কার। ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশের (টিওবি) ৩৯ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী সম্প্রতি তিন দিনে ৯৪টি বস্তায় করিয়া এই ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেন। গত বত্সর তাহারা ১৪০ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করিয়াছিলেন। এইবার তাহারা আরো সফলতার পরিচয় দিয়াছেন। তাহাদের ফেসবুক গ্রুপে ১০ লক্ষ ভ্রমণপিপাসু রহিয়াছেন। তাহাদের সাফল্যের এই গল্পটি সকলের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের এক মূল্যবান সম্পদ। ইহা দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। লম্বায় চার ও প্রস্থে দুই কিলোমিটারের এই ছোট্ট দ্বীপটি দেখিতে ডিম্বাকৃতির। এই দ্বীপ হাজার বত্সরেরও বেশি পুরাতন। গত বত্সর করা পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী এই দ্বীপ এলাকায় ৬৮ প্রজাতির প্রবাল রহিয়াছে। রহিয়াছে বহু জাতের মাছ, কাঁকড়া, শৈবাল, শামুক, ঝিনুক ও কড়ি। আছে এক শতাধিক প্রজাতির পাখি, পাঁচ প্রজাতির ডলফিন, কচ্ছপ ও তিমি এবং বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক ঘাস। পৃথিবীর খুব কম দ্বীপেই রহিয়াছে এমন বৈশিষ্ট্য। এইজন্য পর্যটনের জন্য দ্বীপটি খুবই আকর্ষণীয়। এইখানে সমুদ্রের তলদেশ ড্রাইভ দেওয়ার মতো চিত্তবিনোদনের সুযোগও রহিয়াছে; কিন্তু ইহার পরিবেশ রক্ষায় পর্যটক ধারণের ক্ষমতাকে বিবেচনায় না নেওয়ায় তথা অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ আজ বিপর্যস্ত। এইখানে যত্রতত্র দেখা যায় রকমারি আবর্জনা-উচ্ছিষ্ট, রান্নার বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, টিনের ক্যানসহ আরো কত কী! এমনকি দূরের সৈকতেও দেখা যায় পচা দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা। ফলে লক্ষ করা যায় কাক ও কুকুরের ছড়াছড়ি। এখানকার পাঁচ শতাংশেরও বাড়িতে নাই স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। ফলে সব মিলাইয়া দ্বীপটির পানিতে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের চাইতে ১০ গুণ বেশি জীবাণু পাওয়া গিয়াছে।
সরকার ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসাবে ঘোষণা করে। ইহার ফলে এই দ্বীপে পানি, মাটি, বায়ু বা প্রাণির ক্ষতিসাধিত হয়, এমন কোনো কাজ করা এইখানে যাইবে না; কিন্তু কে মানে সেই নীতি! বিশেষ করিয়া এইখানকার প্লাস্টিক বর্জ্য সামগ্রিক পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও হুমকি স্বরূপ। পর্যটন মৌসুমে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে প্রতিদিন সাত-আটটি জাহাজ ও অর্ধশতাধিক ট্রলারে করিয়া ১০-১২ হাজারের মতো পর্যটক সেন্টামার্টিন দ্বীপে ভ্রমণে আসেন। তাহারা প্লাস্টিকের বোতল, চিপস ও বিস্কুটের প্যাকেট যত্রতত্র ফেলিয়া রাখেন। স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা যতটুকু বর্জ্য পরিষ্কার করিয়াছে তাহা মোট বর্জ্যের ৫ শতাংশও হইবে না। ইহাতে বোঝা যায়, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ কী হারে দূষিত হইতেছে! সামান্য হইলেও স্বেচ্ছাসেবীদের এই উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য। তাহাদের এই উদ্যোগে কর্তৃপক্ষের যদি টনক না নড়ে এবং আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি না পায়, তাহা হইবে লজ্জা ও দুঃখজনক।
